ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে অনেক বড় ইনিংস দেখা গেছে, অনেক বিধ্বংসী ব্যাটিংও হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ইনিংস থাকে, যেগুলো শুধু স্কোরবোর্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো আলাদা করে জায়গা করে নেয় দর্শকের স্মৃতিতে। ইউল্যাব মাঠে হাবিবুর রহমান সোহানের ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসা ৫৮ বলে ১৩০ রানের ইনিংস ছিল ঠিক তেমনই এক প্রদর্শনী-যেখানে ছিল শক্তি, গতি, আত্মবিশ্বাস আর রেকর্ড ভাঙার ক্ষুধা।
আজ সিটি ক্লাবের বিপক্ষে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের জয়টি পরিসংখ্যানের ভাষায় ৭৪ রানের। কিন্তু ম্যাচের ভেতরের গল্প আরও বড়। কারণ এই ম্যাচেই বাংলাদেশের লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট পেল নতুন দ্রুততম সেঞ্চুরির মালিক। আর সেই রেকর্ড গড়লেন এমন একজন ব্যাটার, যিনি আগের রেকর্ডটিও নিজের দখলে রেখেছিলেন।
ম্যাচের শুরুটা কিন্তু মোটেও ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল না। সোহান প্রথম ৯ বলে করেছিলেন মাত্র ৬ রান। বোলাররা লাইন-লেন্থ ধরে রেখে তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো-একজন সেট হয়ে যাওয়া ব্যাটার কত দ্রুত ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে পারেন। নিহাদ উজ জামানের একটি ওভার থেকেই শুরু হয় সেই বিস্ফোরণ। কয়েকটি বাউন্ডারির পর হঠাৎ যেন গতি পাল্টে যায় ম্যাচের। এরপর আর থামেননি সোহান।
মাত্র ২৬ বলে ফিফটি। তারপর আরও দ্রুতগতিতে শতকের দিকে ছুটে চলা। ৪৫ বলে যখন তিন অঙ্ক স্পর্শ করলেন, তখন ইউল্যাব মাঠে উপস্থিত সবাই বুঝতে পারছিলেন তারা কেবল একটি বড় ইনিংস নয়, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছেন। বাংলাদেশের লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে এর আগে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল ৪৯ বলে, সেটিও ছিল সোহানের। এবার তিনি নিজেকেই ছাড়িয়ে গেলেন।
তার ইনিংসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল শট নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস। প্রতিটি বড় শট ছিল পরিকল্পিত, প্রতিটি আক্রমণ ছিল হিসাব করা। ১৩টি ছক্কা ও ৮টি চার মেরে তিনি যেন পুরো মাঠকে নিজের অনুশীলনের জায়গা বানিয়ে ফেলেছিলেন। মিডউইকেট, লং অন, এক্সট্রা কভার-কোনো অঞ্চলই নিরাপদ ছিল না। বাংলাদেশের লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে এক ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড এখন তার দখলে।
এই ইনিংসকে হঠাৎ পাওয়া বিস্ময় বলার সুযোগও কম। কারণ গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সোহান ধারাবাহিকভাবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলছেন। মোহামেডানের বিপক্ষে ১৫ বলে ফিফটি, জাতীয় দলের পেসারদের বিপক্ষে ভয়হীন ব্যাটিং-সব মিলিয়ে তিনি আগেই জানান দিচ্ছিলেন নিজের সামর্থ্যের কথা। এবার সেই সম্ভাবনা রূপ নিল পূর্ণাঙ্গ বিস্ফোরণে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়-আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো স্বাভাবিক পাওয়ার হিটার কোথায়? প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ ব্যাটার বাংলাদেশ পেয়েছে অনেক, কিন্তু শুরু থেকেই ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারে এমন ক্রিকেটার খুব বেশি আসেনি। হাবিবুর রহমান সোহানের ব্যাটিং সেই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
তার ব্যাটিংয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি চোখে পড়ে, সেটি হলো ভয়হীনতা। তিনি শুধু রান করতে নামেন না, প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভেঙে দিতে নামেন। আধুনিক ক্রিকেটে এই মানসিকতাই সবচেয়ে মূল্যবান। কারণ এখন শুধু টিকে থাকা নয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়াই বড় ব্যাপার।
সোহানের রেকর্ডের তালিকাও দ্রুত সমৃদ্ধ হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে দ্রুততম টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরির রেকর্ডও তার। রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপে হংকং চায়নার বিপক্ষে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে মাত্র ৩৫ বলে শতক করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ সাদা বলের ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা তিনি একাধিকবার প্রমাণ করেছেন।
অবশ্য ম্যাচে সিটি ক্লাব একেবারে লড়াই ছাড়াই হারেনি। ৩২৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে তারা। ৭৮ রানেই হারায় ৬ উইকেট। সেখান থেকে অধিনায়ক নিহাদ উজ জামান ও ওপেনার সাদিকুর রহমান দলকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন। নিহাদ করেন ৭২ রান, আর সাদিকুর খেলেন ১০১ রানের শতকীয় ইনিংস। কিন্তু এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গেলে শুরু থেকেই প্রয়োজন ছিল নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন, যা তারা পায়নি।
রূপগঞ্জের বোলাররাও ব্যাটারদের কাজ সহজ করে দেননি। সফর আলি ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন। আহমেদ শরিফ ও রবিউল ইসলাম রবি নেন দুটি করে উইকেট। পুরো ম্যাচজুড়েই রূপগঞ্জ ছিল বেশি সংগঠিত, বেশি আত্মবিশ্বাসী।
এই জয়ে পয়েন্ট তালিকার লড়াইও জমে উঠেছে। ১০ ম্যাচে ১২ পয়েন্ট নিয়ে চারে উঠে এসেছে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ। শীর্ষ তিনে থাকা মোহামেডান, আবাহনী ও প্রাইম ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবধান খুব বেশি নয়। তবে এই ম্যাচের পর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো পয়েন্ট নয়, বরং নতুন এক তারকার জন্ম।
কারণ কিছু ইনিংস শুধু ম্যাচ জেতায় না, ভবিষ্যতের গল্পও লিখে দেয়। হাবিবুর রহমান সোহানের এই ৪৫ বলের শতক হয়তো তেমনই একটি অধ্যায়ের শুরু!









Discussion about this post