সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিতীয় টেস্ট এখন রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। চার দিনের লড়াই শেষে ম্যাচ এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি বল, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি মুহূর্ত নির্ধারণ করতে পারে ফলাফল। পাকিস্তানের সামনে ৪৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য ছুড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চতুর্থ দিনের খেলা শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ৭ উইকেটে ৩১৬ রান। জয়ের জন্য শেষ দিনে তাদের প্রয়োজন আরও ১২১ রান, আর বাংলাদেশের দরকার মাত্র ৩ উইকেট।
আজ দিনের শুরুতে বাংলাদেশ দারুণভাবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পাকিস্তানের ইনিংসের ১১তম ওভারে গতি দিয়ে আঘাত করেন নাহিদ রানা। তার বল গালিতে ক্যাচ তুলে দিলে মেহেদী হাসান মিরাজ অসাধারণ দক্ষতায় আব্দুল্লাহ ফজলকে ফেরান। এরপর মিরাজ নিজেই এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন আজান আওয়াইসকে। শুরুতেই দুই উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান কিছুটা চাপে পড়ে গেলেও সেই চাপ সামাল দেন বাবর আজম ও অধিনায়ক শান মাসুদ।
তৃতীয় উইকেটে এই দুই ব্যাটার ৯২ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে পাকিস্তানকে লড়াইয়ে ফেরান। বাবর ছিলেন স্বাভাবিক ছন্দে, আর শান খেলছিলেন দায়িত্বশীল ইনিংস। তবে এই জুটিও ভাঙেন অভিজ্ঞ স্পিনার তাইজুল ইসলাম। তার ঘূর্ণিতে বিভ্রান্ত হয়ে বাবর আজমের ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় উইকেটকিপার লিটন দাসের গ্লাভসে। ৪৭ রান করে ফিরে যান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় তারকা ব্যাটার।
বাবরের বিদায়ের পর দ্রুত আরও দুটি উইকেট হারায় পাকিস্তান। সৌদ শাকিল মাত্র ৬ রান করে নাহিদ রানার বলে লিটনের হাতে ক্যাচ দেন। এরপর ৭১ রান করা শান মাসুদও তাইজুল ইসলামের শিকার হন। সেই সময় মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ সহজেই ম্যাচ শেষ করে ফেলবে। কিন্তু তখনই দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আলি আগা।
ষষ্ঠ উইকেটে তাদের ১৩৪ রানের জুটি পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দেয়। একদিকে রিজওয়ানের ধৈর্যশীল ব্যাটিং, অন্যদিকে সালমানের ইতিবাচক শট খেলা-দুজন মিলে বাংলাদেশি বোলারদের বিপাকে ফেলেন। ধীরে ধীরে পাকিস্তান জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। মাঠে তখন চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যেও।
তবে বাংলাদেশের ত্রাতা হয়ে আবারও সামনে আসেন তাইজুল ইসলাম। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তিনি ৭১ রান করা সালমানকে বোল্ড করে গুরুত্বপূর্ণ জুটি ভাঙেন। সেই উইকেট যেন পুরো ম্যাচের আবহই বদলে দেয়। সালমানের বিদায়ের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই হাসান আলীকেও ফেরান তাইজুল। স্লিপে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ৬ বল টিকে ফিরতে হয় তাকে। মাত্র ৮ বলের ব্যবধানে দুই উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশ আবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে আসে।
দিন শেষে পাকিস্তানের ভরসা এখন একমাত্র মোহাম্মদ রিজওয়ান। তিনি ১৩৪ বলে ৭৫ রানে অপরাজিত আছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন সাজিদ খান। তবে নতুন দিনে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণ সামলানো। কারণ পঞ্চম দিনের উইকেট স্পিনারদের আরও সহায়তা করতে পারে।
এই টেস্টে শুধু ক্রিকেটীয় দক্ষতাই নয়, মানসিক লড়াইও ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঠে বারবার স্লেজিং, কথার লড়াই এবং সময়ক্ষেপণের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মোহাম্মদ রিজওয়ানের আচরণ নিয়ে আলোচনা বেশি হয়েছে। কখনো চোটের অজুহাত, কখনো খেলা থামিয়ে সময় নেওয়ার প্রবণতা ম্যাচে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশি ক্রিকেটাররাও পাল্টা স্লেজিংয়ের মাধ্যমে চাপ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। ফলে পুরো ম্যাচজুড়ে উত্তেজনা ছিল স্পষ্ট।
বাংলাদেশের জয়ের ভিত্তি মূলত গড়ে ওঠে দ্বিতীয় ইনিংসে। মুশফিকুর রহিমের ১৩৭ রানের অনবদ্য ইনিংস দলকে বড় সংগ্রহ এনে দেয়। এছাড়া মাহমুদুল হাসান জয় ৫২ এবং লিটন দাস ৬৯ রান করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এর আগে প্রথম ইনিংসেও লিটনের ১২৬ রান বাংলাদেশকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখে।
বোলিংয়ে তাইজুল ইসলাম ছিলেন সবচেয়ে সফল। ৩১ ওভারে ১১৩ রান দিয়ে তিনি নিয়েছেন ৪ উইকেট। নাহিদ রানার গতিও পাকিস্তানি ব্যাটারদের ভুগিয়েছে। তরুণ এই পেসার পেয়েছেন দুটি উইকেট। মিরাজও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একটি উইকেট তুলে দেন।









Discussion about this post