বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়াটা অনেক সময় পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশ নারী দলের জন্যও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তেমনই একটি উপলক্ষ। চাপের ম্যাচে তারা শুধু জিতেইনি, দেখিয়েছে কঠিন পরিস্থিতি সামলে ম্যাচ শেষ করে আসার মানসিকতাও। জুয়াইরিয়া ফেরদৌসের ঝলমলে ফিফটি আর শারমিন আক্তার-স্বর্ণা আক্তারের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে বাংলাদেশের হাসি দিয়ে।
এজবাস্টনে আজ রোববার টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ে নেমেছিল নেদারল্যান্ডস। শুরু থেকেই ডাচ ব্যাটারদের বড় জুটি গড়ার সুযোগ দেয়নি বাংলাদেশের বোলাররা। নতুন বলে গতি ও নিয়ন্ত্রণের দারুণ মিশেল দেখান মারুফা আক্তার। ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারেই প্রথম সাফল্য এনে দেন তিনি। এরপর ফারিহা তৃষ্ণা আর রাবেয়া খানের আঘাতে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে নেদারল্যান্ডস।
তবু একপ্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান অধিনায়ক বাবেটা ডি লিডি। দলের ব্যাটিং ব্যর্থতার মাঝেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। ৪৫ বলে ৭৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে একাই প্রায় অর্ধেক রান যোগ করেন তিনি। ডি লিডির দৃঢ়তায় ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৩৯ রানের সংগ্রহ দাঁড় করায় নেদারল্যান্ডস। স্কোরটি খুব বড় না হলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে চ্যালেঞ্জিং ছিল যথেষ্ট।
লক্ষ্য তাড়ায় নেমে শুরু থেকেই ইতিবাচক ছিল বাংলাদেশ। ওপেনিংয়ে নেমে জুয়াইরিয়া ফেরদৌস ও দিলারা আক্তার ডাচ বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। পাওয়ার প্লের ছয় ওভারে বিনা উইকেটে ৪৬ রান তুলে নেন তারা। বিশেষ করে জুয়াইরিয়া ছিলেন আক্রমণাত্মক মেজাজে। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে কোনো জড়তা দেখা যায়নি তার ব্যাটে।
অবশ্য ভাগ্যও ছিল তার পক্ষে। ৭ রানে একটি ক্যাচ থেকে বেঁচে যান তিনি। পরে ১৮ রানেও আরেকবার জীবন পান। সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন তরুণ এই ওপেনার। ক্রিজে থিতু হওয়ার পর একের পর এক বাউন্ডারিতে ম্যাচের রাশ নিজের হাতে তুলে নেন। মাত্র ৩২ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৩৩ বলে ৫০ রান করে ফেরেন, যেখানে ছিল সাতটি চার ও দুটি ছক্কা।
জুয়াইরিয়া ও দিলারার ৬৭ রানের উদ্বোধনী জুটি বাংলাদেশের জয়কে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের বিদায়ের পর হঠাৎই ম্যাচে ফিরে আসে নেদারল্যান্ডস। জুয়াইরিয়ার আউট হওয়ার পরের বলেই শূন্য রানে ফিরে যান অধিনায়ক নিগার সুলতানা। এরপর দিলারা ২৬ রান করে বিদায় নেন। সোবহানা মোস্তারিও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ৬৭ রানে উইকেটহীন থাকা বাংলাদেশ ৮৫ রানে হারায় ৪ উইকেট।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন পরিস্থিতিতে অনেক দলই চাপে পড়ে যায়। তবে বাংলাদেশকে সেই পথে যেতে দেননি শারমিন আক্তার সুপ্তা ও স্বর্ণা আক্তার। তারা বুঝে শুনে ব্যাটিং করেন, ঝুঁকি না নিয়ে ম্যাচকে গভীরে নিয়ে যান। রানরেট কখনোই হাতছাড়া হতে দেননি দুজন।
শারমিন ছিলেন ইনিংসের নীরব স্থপতি। চারটি বাউন্ডারিতে ৩২ বলে ৩৭ রান করেন তিনি। অন্যদিকে স্বর্ণা আক্তার খেলেন ১৭ বলে ১৮ রানের কার্যকর ইনিংস। পঞ্চম উইকেটে অবিচ্ছিন্ন ৫৬ রানের জুটিতে ম্যাচ শেষ করে মাঠ ছাড়েন তারা। শেষ ওভারে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩ রান, আর প্রথম বলেই বাউন্ডারি হাঁকিয়ে জয় নিশ্চিত করেন স্বর্ণা।
এই জয়ের মাধ্যমে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসে বাংলাদেশের জয়সংখ্যা দাঁড়াল চারটিতে। সাতটি আসরে অংশ নিয়ে ২৬ ম্যাচ খেলে এটি তাদের চতুর্থ জয়। পরিসংখ্যানের হিসেবে হয়তো এটি আরেকটি জয়, কিন্তু দলের আত্মবিশ্বাসের বিচারে এর মূল্য অনেক বেশি।
বিশ্বকাপের আগে স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে ছন্দে ছিল না বাংলাদেশ। ছয় ম্যাচে মাত্র দুটি জয় পেয়েছিল তারা। সেই অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে বিশ্বমঞ্চে জয়ের সূচনা নিঃসন্দেহে স্বস্তির। আরও বড় কথা, দলের তরুণ খেলোয়াড়রা দায়িত্ব নিয়ে পারফর্ম করেছেন, যা সামনের ম্যাচগুলোর জন্য ইতিবাচক বার্তা।
এখন বাংলাদেশের সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা। বুধবার হেডিংলিতে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান শক্তিধর অস্ট্রেলিয়া। তবে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পাওয়া এই জয় অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত করেছে-বিশ্বকাপে শুধু অংশ নিতে নয়, লড়তে এবং জিততেই এসেছে নিগার সুলতানার দল।










Discussion about this post