বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম একসময় ছিলেন তিনি। অথচ এখন তিনি দেশের ক্রিকেটে অতীত। সাকিব আল হাসান-যার হাতে একসময় বাংলাদেশ জিতেছে অকল্পনীয় ম্যাচ, যিনি এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্রিকেটের মুখ ছিলেন-এখন দেশের বাইরে, দলের বাইরে, এবং যেন সময়েরও বাইরে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের বিপক্ষে সিরিজই হয়ে ওঠে তার শেষ আন্তর্জাতিক সফর। এরপর থেকে আর বাংলাদেশ জার্সিতে দেখা যায়নি এই অলরাউন্ডারকে। বয়স পেরিয়েছে ৩৮, মাঠে ফেরার সম্ভাবনা এখন প্রায় অনুপস্থিত। ক্রিকেটীয়ভাবে বিদায় জানানোর ইচ্ছা থাকলেও রাজনীতির জটিল সমীকরণে তা আর সম্ভব হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত সংসদ সদস্য ছিলেন সাকিব আল হাসান। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি কার্যত নির্বাসিত জীবনে। দেশে ফেরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন; ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পরামর্শেই সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে হয়।
ভারত সফরের সময়ই সাকিব ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার টি–টোয়েন্টি ক্যারিয়ার শেষ। তবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলেই ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু বোলিং অ্যাকশন নিয়ে নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্বাচকরা কেবল ব্যাটার হিসেবে তাকে দলে নেননি। সেই থেকেই জাতীয় দল থেকে দূরে সরে গেছেন দেশের সবচেয়ে সফল অলরাউন্ডার।
কানপুর টেস্টের আগে নিজের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন সাকিব। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মাটিতে, বিশেষ করে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে নিজের শেষ টেস্ট খেলতে চান। কিন্তু সেই সুযোগ আর আসেনি।
এবার ক্রিকবাজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ফরম্যাট থেকে অবসর নিইনি। আমি মনে করি, মিরপুরে আমার শেষ ম্যাচটা হলে সেটা শুধু আমার জন্য নয়, আমার ভক্তদের জন্যও এক সুন্দর বিদায় হতো।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশজুড়ে যখন গণঅভ্যুত্থান, তখন সাকিব ছিলেন বিদেশে পরিবারের সঙ্গে ছুটিতে। ঠিক সেই সময় তার স্ত্রীর ফেসবুকে পোস্ট হয় হাস্যোজ্জ্বল কিছু ছবি। দেশজুড়ে সহিংসতা ও রক্তপাত চলাকালে সেই ছবি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই মনে করেন, এটি তার জনপ্রিয়তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সাকিব অবশ্য সেই সময়ের ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘সেটা শুধু একটা মুহূর্ত ছিল, যা আমার বিপক্ষে গেছে। আমি তখন বাড়ি থেকে অনেক দূরে ছিলাম, পরিস্থিতিটা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। মানুষ এখন ধীরে ধীরে সেটা বুঝতে পারছে বলে মনে করি।’
দেশে থাকাকালে বিভিন্ন ব্র্যান্ড উদ্বোধন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং স্পনসর ইভেন্টে ব্যস্ত থাকতেন সাকিব। কেউ কেউ ঠাট্টা করে তাকে ডাকত “শোরুম আল হাসান” নামে। আবার দুর্ব্যবহার ও রাগী মেজাজ নিয়েও ছিল নানা অভিযোগ। সাকিব অবশ্য এসবকেই ‘মিডিয়ার বানানো গল্প’ বলে উড়িয়ে দেন।
সাকিবের ভাষায়, ‘বাংলাদেশে আমি অনেক কিছু করেছি, যা আগে কেউ করেনি। তাই অনেকে সেটা সহজে নিতে পারেনি। এখন অন্য কেউ করলে তেমন প্রতিক্রিয়া হয় না, কিন্তু আমি ছিলাম প্রথম-ভালো আর খারাপ দুই দিকেই।’
নিজেকে নিয়ে বিতর্ক বা সমালোচনায় এখন আর খুব একটা বিচলিত নন সাকিব, ‘মানুষের নিজস্ব ভাবনা থাকতেই পারে। আমি শুধু আমার কাছের মানুষগুলো কী ভাবছে সেটাই দেখি। তাদের কাছে আমি যেভাবে আছি, সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে এখনো নিয়মিত খেলছেন সাকিব। ভালো পারফরম্যান্স করলেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার ফেরার দাবি ওঠে নতুন করে, কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতায় সেই সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সম্প্রতি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘সাকিবকে আমরা আর বাংলাদেশ দলের জার্সিতে দেখতে চাই না।’
বাংলাদেশ ক্রিকেটের পোস্টারবয়, একসময় যার নামেই দর্শক স্টেডিয়াম ভরাত, তিনি আজ নিজ দেশেই পরিত্যক্ত এক নায়কের প্রতীক। তবু সাকিবের কণ্ঠে এখনো মৃদু আশার সুর, ‘যদি কোনোদিন মিরপুরে শেষ ম্যাচটা খেলতে পারি, তাহলে সেটাই হবে আমার এবং ভক্তদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর বিদায়।’










Discussion about this post