আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও একই গ্রুপে পড়েছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বহুল আলোচিত এই ম্যাচকে ঘিরে। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ভারতের বিপক্ষে খেলবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। প্রথমদিকে এই সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট না করলেও পরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানান, বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানাতেই এই বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘আমরা টি-২০ বিশ্বকাপ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছি যে, আমরা ভারতের বিপক্ষে খেলব না। কারণ খেলার মাঠে কোনো রাজনীতি হওয়া উচিত নয়। আমরা খুবই বিবেচনামূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আমাদের সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকা উচিত। আমি মনে করি ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কট ছিল উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।’
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘ধন্যবাদ পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, বাংলাদেশকে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে তার দেশ ভারত ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রিসভার সদস্যদের তিনি বলেন, আমরা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলব না। কারণ খেলার মাঠে কোনো রাজনীতি থাকা উচিত নয়। আমরা খুব ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমি মনে করি এটি খুবই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।’
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাটিতে শুরু হওয়ার কথা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসরের। আইসিসির পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচ ভারত-পাকিস্তান লড়াই। তবে সালমান-শাহিনদের দেশ ইতোমধ্যেই এই ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেওয়ায় ম্যাচটি আদৌ মাঠে গড়াবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর আগেও বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পুরো বিশ্বকাপ বয়কটের ইঙ্গিত দিয়েছিল পাকিস্তান। পিসিবি সভাপতি মহসিন নাকভি আইসিসির পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে করা বৈষম্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে আইসিসি-এমন আশঙ্কাও সামনে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই একটি ম্যাচ না হলে আইসিসির ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। সংবাদসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চার বছরের চুক্তিতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ অন্তর্ভুক্ত থাকায় চুক্তির অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। এখন সেই ম্যাচ না হলে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে আইসিসির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ কারণে পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এর আগে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ জানিয়ে বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি সহ-আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কায় নিজেদের ম্যাচগুলো সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আসছিল বিসিবি। সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আইসিসি ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর পরপরই ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয় পাকিস্তান।
নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের পাশে যে পাকিস্তান রয়েছে, তা আবারও স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি জানান, বাংলাদেশকে সমর্থন করেই ভারতের বিপক্ষে না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট দল। তিনি বলেন, ‘আমরা সব দিক বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত (ভারত-ম্যাচ বয়কট) নিয়েছি। বাংলাদেশের পাশে আছি আমরা। আমার মতে, এটা সেরা সিদ্ধান্ত।’
ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে গত ১৩ বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ অনুষ্ঠিত হয়নি। এমনকি পাকিস্তান কোনো টুর্নামেন্টের আয়োজক হলেও ভারতের কারণে সেই টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে হয়েছে ‘হাইব্রিড মডেলে’। ২০২৩ এশিয়া কাপ ও ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি তার উদাহরণ। ২০২৫ এশিয়া কাপে তিনবার ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হলেও মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে রাজনৈতিক আলোচনা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
এখনো পর্যন্ত ভারত ম্যাচ বয়কটের বিষয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড সরাসরি কোনো বক্তব্য দেয়নি। আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কী জানানো হয়েছে, সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পাকিস্তান সরকারের এক্স হ্যান্ডলে ১ ফেব্রুয়ারি দেওয়া ঘোষণার পর থেকে অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন শেহবাজ শরিফ। তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমরা ভারতের বিপক্ষে খেলব না। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। কারণ, খেলার মাঠে কোনো রাজনীতি থাকা উচিত না।’
এই সিদ্ধান্তের ফলে আইসিসি, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান এবং দুই বোর্ডই বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকারও বেশি। ম্যাচটি না হলে মাত্র ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন বাবদ আইসিসির ক্ষতি হবে প্রায় ৫৪ লাখ টাকা। সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের লোকসান হতে পারে ৪০০ কোটির বেশি টাকা, আর বিসিসিআই ও পিসিবি—দুই বোর্ডেরই শত শত কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মাঠে গড়ানো নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।










Discussion about this post