জাতীয় দলের দুয়ার দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল তাঁর জন্য। একসময় নিয়মিত সুযোগ পেলেও নিজের সামর্থ্যের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে না পারায় জায়গা হারিয়েছিলেন। এরপর কেটে গেছে সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময়। তবে সুযোগ ফিরে পেয়ে দারুণভাবে নিজেকে প্রমাণ করলেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। গতকাল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে অলরাউন্ড নৈপুণ্যে বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়ে হয়েছেন ম্যাচসেরা।
বাংলাদেশের হয়ে মোসাদ্দেকের অভিষেক হয়েছিল ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। তবে জাতীয় দলে কখনোই দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজের জায়গা স্থায়ী করতে পারেননি। এর আগে সবশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলেন ২০২২ সালের নভেম্বরে। এরপর দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করে গেছেন তিনি। অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে সুযোগ পেয়ে নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দিলেন দুর্দান্তভাবে।
মিরপুরে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৭০ বলে ৮৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন মোসাদ্দেক। পরে বল হাতেও অবদান রেখে তুলে নেন দুটি উইকেট। তাঁর অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ভর করে ২১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে জয় পায় বাংলাদেশ। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর এমন প্রত্যাবর্তনে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত মোসাদ্দেক। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় দলের বাইরে থাকার কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘হতাশা (দলের বাইরে থাকায়) তো অবশ্যই ছিল। আমার জন্য খুব সহজ সময় ছিল এ রকমও না। আমার সংগ্রামের সময়টা হয়ত অনেকেই আপনারা দেখেছেন, অনেকেই দেখেননি। সেখান থেকে আমি ধৈর্য ধরে আমার কাজগুলো করার চেষ্টা করেছি। এটা মাথায় ছিল যে সুযোগ যদি আসে আমি যেন সেই সুযোগ ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারি। মাশা আল্লাহ যতটুকু না চেয়েছি আল্লাহ তায়ালা তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছেন।’
জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও নিজের ওপর বিশ্বাস হারাননি বলে জানান এই অলরাউন্ডার। তিনি বলেন, ‘আমি গত কয়েক বছরে ঘরোয়াতে যেভাবে খেলছিলাম এটুকু বিশ্বাস ছিল, এভাবে চালিয়ে যেতে পারলে আমার একটা না একটা সময়ে গিয়ে সুযোগ আসবে। আমি ধন্যবাদ দিতে চাই টিম ম্যানেজমেন্টকে। খেলা শুরুর আগে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, আমাকে বলা হয়েছে খেলাটা উপভোগ করতে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আমি কেবল আমার কাজটা করে গেছি।’
দলের বাইরে কাটানো সময়ের কষ্টের কথাও লুকাননি মোসাদ্দেক। তিনি বলেন, ‘কষ্ট তো ছিলই, যদি টানা পারফর্ম করতে থাকি সুযোগ আসতে পারে। ধন্যবাদ যে পেয়েছি সুযোগ। সবাই দোয়া কইরেন যেন আমি এটা চালিয়ে যেতে পারি।’
দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকার দায় নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন তিনি। মোসাদ্দেক বলেন, ‘সামর্থ্য অনুযায়ী আমি কখনোই ওভাবে পারফর্ম করতে পারিনি। আমার ঘাটতিটাই সব সময় দেখার চেষ্টা করি। এখন পর্যন্ত এটাই বিশ্বাস করি, যেটা হয়ে গেছে, সেটা আমার ঘাটতি ছিল। আগের ব্যাপার তো আর ফিরে আসবে না। আমি কেবল চেষ্টা করেছি কীভাবে সুযোগ আসলে কাজে লাগাতে পারি। সেভাবেই অনুশীলন করার চেষ্টা করেছি।’
নিজের ব্যাটিং দর্শন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ঘরোয়াতে আমি এভাবেই খেলার চেষ্টা করি। এখনকার ক্রিকেটের কথা যদি ভাবি সেই জিনিসটা মাথায় থাকত পরিস্থিতি বা স্ট্রাইক রেটের ব্যাপারটা। তো ওই জিনিসটা সেখান থেকে এখানে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। পারফরম্যান্স ধরে রাখার চেষ্টা করব।’
ইনিংস গড়ার পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। মোসাদ্দেক বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি যতক্ষণ সুযোগ আছে যেন বেশি রান করতে পারি। আর আমি আমার জোনের শটগুলা খেলে গছি।’
দীর্ঘদিন পর দলে ফিরে সতীর্থদের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনের জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। মোসাদ্দেক বলেন, ‘সবাই সাপোর্ট করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে যেহেতু অনেক দিন পরে এসেছি। পুরো দলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমার কাছে মনে হয় ঘরোয়াতে যেখানেই খেলি, যদি ভালো উইকেটে খেলতে পারি, আমাদের জন্য ভালো।’
ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্স যে তাকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছে, সেটিও উল্লেখ করেন এই অলরাউন্ডার। তাঁর ভাষায়, ‘অবশ্যই আমাকে (ঘরোয়ার পারফরম্যান্স) বুস্ট আপ করেছে। পারফর্ম করতে থাকলে মাথায় কাজ করে সুযোগ আসতে পারে। সবাই চেষ্টা করে দেশকে সার্ভ করার, এটাই মেইন টার্গেট। অবশ্যই ডিপিএলসহ সবকিছুর পারফরম্যান্সের একটা ভ্যালু আছে।’
ক্যারিয়ারের আগের সময় নিয়ে আক্ষেপও রয়েছে তাঁর। তবে সেই আক্ষেপকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে চান তিনি। মোসাদ্দেক বলেন, ‘আক্ষেপ অবশ্যই কাজ করে। আমার প্রতিভা অনুযায়ী আমি সেভাবে ডেলিভার করতে পারিনি। এখন সেটা মেনে নিয়ে চেষ্টা করছি সামনে যেন ভালো করতে পারি। ভেবেছিলাম (উদাহরণ তৈরি করতে চাই), আসলে কাকে কখন খেলাবে এটা ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত। যারা ঘরোয়াতে ভালো করছে সেটা করে গেলে তাদের জন্য ভালো সুযোগ সবসময়, যারা জাতীয় দলে খেলতে চায় তারা অবশ্যই সেই সুযোগটা নিতে চাইবে।’








Discussion about this post