বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের মন্তব্যকে ঘিরে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন এসে ঠেকেছে ৪৮ ঘণ্টার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমায়। বৃহস্পতিবার দিনভর নাজমুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে বিসিবি। রাতে সংবাদ সম্মেলনে বোর্ড পরিচালক ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু জানিয়ে দেন, কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত নাজমুলের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এই অবস্থায় বিসিবি গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই এগোচ্ছে বলে জানান ইফতেখার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না এলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এমন ইঙ্গিতও দেন তিনি। মিঠুর ভাষায়, ‘তাকে তার কমিটি (অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান) থেকে অপসারণ করা হয়েছে। আমরা তো গঠনতন্ত্রের অধীনে চলি। প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাকে শোকজ করা হয়েছে। এজন্য সময় দেওয়া হয়েছে ৪৮ ঘণ্টা। সেই সময়সীমা ১৭ জানুয়ারি দুপুরে শেষ হবে, তার জবাব দেওয়ার (সুযোগ ততক্ষণ পর্যন্ত)।’
কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব এলে পরবর্তী ধাপ কী হবে, সেটিও পরিষ্কার করেন বিসিবির এই পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এরপর এটা ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে যাবে। একদম গঠনতন্ত্রে লেখা আছে। ডিসিপ্লিনারি কমিটি তাদের প্রক্রিয়ায় আগাবে। এর মধ্যে আমরা চেষ্টা করেছি উনার সঙ্গে সারাদিন যোগাযোগ করতে। আমরা চেয়েছিলাম (তাকে) আজকে এখানে আনার জন্য। কিন্তু উনার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।’
তবে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও যদি নাজমুল ইসলামের কোনো সাড়া না মেলে, তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে বলেই ইঙ্গিত দেন ইফতেখার। তার বক্তব্য ছিল, ‘লাপাত্তা থাকলে… (জবাব) না দিলে, তার মানে আপনি জানেন… আদালতে যদি মামলা করা হয়, আপনি যদি হাজিরা না দেন, এটার ফল তো আমার ব্যাখ্যা করার দরকার নেই।’ এই বক্তব্যে স্পষ্ট, বিসিবির পরিচালক পদ থেকেও নাজমুল ইসলামের অপসারণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ডিসিপ্লিনারি কমিটিকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলে জানান ইফতেখার। তিনি বলেন, ‘আমাদের ডিসিপ্লিনারি কমিটির চেয়ারম্যান হচ্ছে মিতু (ফায়াজুর রহমান)। তার সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি। আমরা নিয়ম অনুসরণ করব। উনি (নাজমুল ইসলাম) জবাব না দিলে, এটার ফল তো উনাকে ভোগ করতে হবে।’ সেই ফল কী—এমন প্রশ্নে মিঠুর উত্তর ছিল সরাসরি, ‘হ্যাঁ।’
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে অস্বাভাবিক বলেও আখ্যা দেন ইফতেখার রহমান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সময়ে সারাদিন চেষ্টা করেও একজন বোর্ড পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা না যাওয়া বিস্ময়কর। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কারণ দর্শানোর নোটিশের এই ৪৮ ঘণ্টার সময়জুড়ে নাজমুল যদি যোগাযোগের বাইরে থাকেন, তাহলে বিসিবির হাতে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া।
নাজমুল ইসলামের বক্তব্য থেকেই এই সংকটের সূচনা। বুধবার বিসিবিতে সংবাদমাধ্যমের সামনে ক্রিকেটারদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন তিনি। ওই রাতেই ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন ঘোষণা দেন, নাজমুল পদত্যাগ না করলে বৃহস্পতিবার বিপিএলের ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই খেলা বন্ধ রাখা হবে। নাজমুল পদত্যাগ না করায় বৃহস্পতিবার নির্ধারিত দুটি ম্যাচের একটিও মাঠে গড়ায়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিসিবি দ্রুত তাকে অর্থ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়। তাতেও তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান আসেনি। দীর্ঘ আলোচনা ও টানাপোড়েনের পর রাতের বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং এরপরই বিপিএল মাঠে ফেরার সিদ্ধান্ত আসে।
এই প্রেক্ষাপটে ইফতেখার মিঠু ব্যক্তিগত অবস্থানও স্পষ্ট করে দেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি আমাকে গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব না ধরেন, সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে আমাকে প্রশ্ন করেন, আমি কিন্তু বলব, উনি (নাজমুল) বিরাট ভুল করেছেন। কোনো মানুষেরই কাউকে ছোট করা অধিকার নেই।’
কারণ দর্শানোর নোটিশের সময় শেষ হওয়ার পর সত্যিই ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না-এই প্রশ্নে ইফতেখার দুটি নজিরের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এমনিতেও উনাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে (অর্থ কমিটি থেকে)… আজ পর্যন্ত আমি শুনিনি বিসিবিতে যে কোনো পরিচালককে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে বা (কমিটি থেকে) সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিসিবির দুটি রেকর্ড তো এর মধ্যেই হয়ে গেছে!”
সবশেষে তিনি জানান, বিসিবির পক্ষ থেকে এখনো চেষ্টা চলছে নাজমুলকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝানোর। ইফতেখার বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মক চেষ্টার করব উনাকে বোঝানোর যে, ‘এটাকে আপনি শেষ করেন। আমরাও মনে করি যে আপনি ভুল বিবৃতি দিয়েছেন।’ তবে ব্যক্তিগতভাবে যার সিদ্ধান্ত, তারই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’










Discussion about this post