বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের একটি মন্তব্য ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক একদিনের মধ্যেই দেশের ক্রিকেটে তৈরি করে দেয় অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। ক্রিকেটারদের কল্যাণ সংগঠন কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুনের নেতৃত্বে বিপিএলের ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্ত, মাঠের বদলে হোটেলে ক্রিকেটারদের অবস্থান, সারাদিনব্যাপী সংবাদ সম্মেলন এবং শেষ পর্যন্ত রাতের সমঝোতা, সব মিলিয়ে নাটকীয় এক অধ্যায় যোগ হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটে।
পরশু নাজমুল ইসলামের মন্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর মিঠুন প্রকাশ্যে তার পদত্যাগ দাবি করেন। একই সঙ্গে জানান, দাবি মানা না হলে ক্রিকেট বন্ধ রাখার কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই ঘোষণার পরদিনই বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়। গতকাল মিরপুরে নোয়াখালী এক্সপ্রেস ও চট্টগ্রাম রয়্যালসের ম্যাচ শুরুর কথা থাকলেও মাঠে নামেননি ক্রিকেটাররা। জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজ, লিটন দাস, তাসকিন আহমেদসহ অনেকে কোয়াব সভাপতির ডাকে জড়ো হন বনানীর শেরাটন হোটেলে।
সারা দিন সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন মিঠুন। আন্দোলনের মাঝেই সামনে আসে আরও ভয়াবহ অভিযোগ-ক্রিকেটারদের লক্ষ্য করে হুমকি। রাতের সংবাদ সম্মেলনে কোয়াব সভাপতি বলেন, ‘আমরা যারা ক্যামেরার সামনে ছিলাম, তাদের সবার কাছেই কোনো না কোনোভাবে এসেছে (হুমকি)। শুধু আমাকে না। অনেক অজানা নাম্বার থেকে আমাদের হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। ব্যাপারটি সত্য।’ তার ভাষায় স্পষ্ট ছিল উদ্বেগ, তবে একই সঙ্গে ছিল অবস্থানে অনড় থাকার বার্তা।
মিঠুন জোর দিয়ে বলেন, তারা কোনোভাবেই বিতর্কিত বা দেশবিরোধী বক্তব্য দেননি। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা সাংবাদিক। আমরা ক্রিকেটার। আমাদের ভাষা আপনারা বোঝেন। আপনাদের ভাষা আমরা বুঝি। আমি যদি কোনো বিতর্কিত কথা বলি, সেটা কিন্তু প্রত্যেক মানুষেরই বোঝার ক্ষমতা আছে। আমি নিশ্চিত যে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করিনি, যেটাতে কাউকে ছোট করে বা কোনো বিতর্কিত বা দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কথা বলিনি।’
দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষির পর রাতে বিসিবি, ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ক্রিকেটারদের বৈঠকে সমঝোতায় পৌঁছানো হয়। এরপর খেলা বর্জনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন মিঠুন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ক্রিকেটের মঙ্গল চাই। খেলা হোক, সেটা আমরাও চাই। ক্রিকেটের স্বার্থে আমরা কাল (আজ) থেকে খেলা শুরু করছি। আলোচনার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে পৌছাতে পেরেছি।’ এক দিনের অচলাবস্থার পর এই ঘোষণায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা।
সমঝোতার ফলে আজ মিরপুরে দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হবে স্থগিত হওয়া চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর ম্যাচ। সন্ধ্যা ৭টায় সিলেট ও রাজশাহীর ম্যাচ দিয়ে পূর্ণ হবে দিনের সূচি। বিসিবি জানিয়েছে, আজকের টিকিট দিয়েই দর্শকেরা স্থগিত ম্যাচ দেখতে পারবেন। পাশাপাশি যারা চাইবেন, তারা অনলাইনে আবেদন করে টিকিটের অর্থ ফেরত পাবেন।
তবে মাঠে খেলা ফিরলেও বিতর্কের আঁচ এখনো রয়ে গেছে। বুধবার (১৫ জানুয়ারি) একটি বেনামি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ অডিও বার্তায় মোহাম্মদ মিঠুনকে সরাসরি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, “তোরা বাংলাদেশ ক্রিকেটে যা শুরু করেছিস তোদের কপালে দুঃখ আছে। বিসিবির বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করতেছিস, ভারতীয় দালাল। স্টেডিয়াম থাকে বের হবি না? স্টেডিয়ামে যাবি না? কোন জায়গায় নিরাপদ থাকবি?” একই বার্তায় অন্য ক্রিকেটারদের পরিবারকেও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং ভয়াবহ পরিণতির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
এই প্রসঙ্গে মিঠুন আবারও স্পষ্ট করে বলেন, ‘ক্যামেরার সামনে আমরা যারা এসেছি, তারা সবাই পেয়েছে (হুমকি), শুধু আমি নই। কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন অচেনা নম্বর থেকে আমাদের বিভিন্ন হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। এটা সত্য।’ তিনি জানান, সম্মান রক্ষার জায়গা থেকেই তাদের এই অবস্থান। মিঠুন বলেন, ‘আমাদের একমাত্র ইস্যু ছিল ক্রিকেট, আমাদের সবার ইস্যু ছিল ক্রিকেট। আমাদের সম্মান। প্রতিটি মানুষের নিজের সম্মান আছে এবং সেটি রক্ষা করার অধিকার তার আছে। আমরা আমাদের সম্মান রক্ষা করার অধিকার থেকে কথা বলেছি।’
মিঠুনের অভিযোগ, আন্দোলনের পর ক্রিকেটারদের দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদেরকে দেশদ্রোহী বা দেশের শত্রু হিসেবে বিভিন্নভাবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। আমরা জানি না, এখানে কোনো একটা শব্দ দেশের বিরুদ্ধে ছিল কি না। আমার মনে হয় না, আমাদের ক্রিকেটাররা বা কোয়াবের যারা আছে, তারা দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কথা বলেছে বা দেশের স্বার্থ রক্ষা না করে কোনো কথা বলেছে।’
হুমকির অভিযোগের পর বিসিবিও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বিসিবি পরিচালক ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান জানান, নিরাপত্তা বিভাগকে বিষয়টি অবহিত করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা বিভাগ আছে। আমরা তো এখন শুনলাম। আমি ওটায় অনুরোধ করব, যার যার কাছে এসেছে (হুমকি), এই ফোন নম্বরগুলি যদি আমাদেরকে দেয়, আমরা আমাদের নিরাপত্তা বিভাগকে দেব, উনারা দায়িত্ব নেবেন। আমরা এটাকে গুরুত্ব দিয়েই নিচ্ছি।’










Discussion about this post