রাতের আলো নিভে আসছিল বিশাখাপত্তমে। গ্যালারিতে তখনও বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে, টিভির সামনে অসংখ্য চোখ তাকিয়ে আছে শেষ ওভারের দিকে। ৮ রান দরকার দক্ষিণ আফ্রিকার। হাতে ৩ উইকেট। বাংলাদেশ জানত, এখান থেকে ম্যাচ জেতা কঠিন-তবু অসম্ভব নয়। বল হাতে এলেন অভিজ্ঞ নাহিদা আকতার। প্রথম বলেই চার খেলেন। দ্বিতীয় বল ডট। একটু আশার আলো। কিন্তু তৃতীয় বলেই যা হলো, তা ছিল যেন হৃদয়ে ছুরি চালানো—ডে ক্লার্ক হাঁকালেন এক বিশাল ছক্কা। জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল দক্ষিণ আফ্রিকা। মাঠে, ডাগআউটে, আর হাজারো সমর্থকের মনে ছড়িয়ে গেল এক নিঃশব্দ হাহাকার।
মেয়েদের ওয়ানডে বিশ্বকাপে আজ সোমবার রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ৩ উইকেটে হারল বাংলাদেশ। ২৩৩ রানের লক্ষ্য তিন বল হাতে রেখে পেরিয়ে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
এমন পরিণতি কেউ ভাবেনি, বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যাটিং ইনিংস দেখে। যে দলটি বিশ্বকাপে একের পর এক ম্যাচে ব্যাটিং ব্যর্থতায় ভুগেছে, সমালোচনার চাপে ছিল, সেই দলই আজ করল বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্কোর—২৩২ রান। শুরুটা করেছিলেন রুবাইয়া হায়দার ঝিলিক ও ফারজানা হক। ৫৩ রানের উদ্বোধনী জুটি দিয়ে দলকে এনে দিয়েছিলেন স্থিতি। এরপর একে একে মাঠে নেমে শারমিন, নিগার, স্বর্ণা-সবাই যেন নতুন এক প্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি।
শারমিন আক্তার সুপ্তার ইনিংসটা ছিল পাথরের মতো দৃঢ়—৭৭ বলে ৫০ রান। আর নিগার জ্যোতি যোগ করলেন দায়িত্বশীল ৩২ রান। কিন্তু আসল আলোড়ন তুললেন স্বর্ণা আক্তার। যখন দ্রুত রান দরকার ছিল, তখন তিনি নামলেন এবং যেন আগুন হয়ে ঝলসে দিলেন প্রতিপক্ষ বোলিং লাইনআপ। মাত্র ৩৪ বলে ফিফটি, শেষ পর্যন্ত ৩৫ বলে ৫১ রান—অপরাজিত। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের নারী ওয়ানডে ইতিহাসে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড নিজের করে নিলেন।
দল ২৩২ তোলার পর আত্মবিশ্বাসী ছিল। এবং সেটার প্রতিফলন দেখা যায় শুরুতেই। দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট এনে দেন নাহিদা, নিজের প্রথম বলেই। প্রতিপক্ষ ৩ রানে প্রথম উইকেট হারায়। এরপর এক পর্যায়ে দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর ৭৮/৫—বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ইতিহাস লিখতে যাচ্ছে তারা।
কিন্তু ক্রিকেট এমনই খেলা-একটি জুটি বদলে দিতে পারে সব হিসাব। কাপ ও ট্রায়নের ৮৫ রানের জুটি ভেঙে দেয় ছন্দ। বাংলাদেশের বোলাররা তখনও লড়াই করছিলেন, তবে সময় ফুরোচ্ছিল।
শেষ ২ ওভারে ম্যাচ গড়ায় নাটকীয় মোড়ে। প্রোটিয়াদের রান তখন কাছে চলে এসেছে, কিন্তু উত্তেজনা তুঙ্গে। এরপর ডে ক্লার্ক, যার ব্যাট সারা ইনিংসে ছিল নির্ভরযোগ্য, তিনিই শেষ ওভারে ম্যাচ শেষ করে দেন। ২৯ বলে ৩৭ রানের ইনিংসটি যতটা মারমুখী ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল ঠাণ্ডা মাথায় খেলা।










Discussion about this post