ঢাকা ক্যাপিটালসের এবারের বিপিএল অভিযান শেষের পথে, আর সেই বিদায়ের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সাইফ হাসানের দীর্ঘ ব্যর্থতার অধ্যায়। রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে শনিবারের ম্যাচটি যেন তার পুরো টুর্নামেন্টের সারসংক্ষেপ। ক্রিজে এসেই প্রথম বলেই বড় শট, পরমুহূর্তেই ফিরে যাওয়া-আগ্রাসন আর অনিশ্চয়তার এই দোলাচলই সাইফের বর্তমান বাস্তবতা।
ফাহিম আশরাফের বলে আব্দুল্লাহ আল মামুন আউট হওয়ার পর দায়িত্ব পড়েছিল অভিজ্ঞতা আর সাহস দেখানোর। প্রথম বলেই এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে মারা ছক্কায় সেটার ইঙ্গিত মিলেছিল। কিন্তু সেটি যে স্থায়ী হবে না, তা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি। নাহিদ রানার গতিময় ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আবারও ব্যর্থতার খাতায় নাম লেখান বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি সহ-অধিনায়ক।
নাহিদের বল নিঃসন্দেহে মানসম্পন্ন ছিল। প্রায় দেড়শ কিলোমিটার গতির সেই ডেলিভারি অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যানকেও বিপদে ফেলতে পারত। তবে সাইফের সমস্যা এখন শুধু প্রতিপক্ষ বোলারের মান নয়। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং পুরোনো টেকনিক্যাল দুর্বলতা মিলিয়ে সাধারণ বলেও তিনি বিপর্যস্ত হচ্ছেন। রান না পাওয়ার চাপ প্রতিটি ইনিংসেই তাকে আরও কোণঠাসা করে তুলছে।
এবারের বিপিএলে আট ইনিংসে ৬০ রান করেছেন সাইফ। গড় ৭.৫০, স্ট্রাইক রেট ৮৩.৩৩। সর্বোচ্চ ইনিংস ২২ রানের। রংপুরের বিপক্ষে ১২ রান করাই হয়ে আছে তার তৃতীয় সেরা ইনিংস। এই পরিসংখ্যান শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার নয়, ঢাকা ক্যাপিটালসের সামগ্রিক হতাশার ছবিও তুলে ধরে। শনিবারের হারের মধ্য দিয়ে দলটির প্লে-অফ স্বপ্নও শেষ হয়ে গেছে।
এই ব্যর্থতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে সাইফ হাসানের সাম্প্রতিক অতীত। এশিয়া কাপ ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে ধারাবাহিক রান তাকে এনে দিয়েছিল নতুন পরিচয়। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছিল তাকে। সেই ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি হিসেবেই ১৮ নভেম্বর তাকে করা হয় জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক। বিপিএলের আগেই সরাসরি চুক্তিতে তাকে দলে নেয় ঢাকা ক্যাপিটালস।
কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তার ব্যাটিং গ্রাফ কেবল নেমেছেই। সহ-অধিনায়ক হওয়ার পর জাতীয় দল ও বিপিএল মিলিয়ে ১১ ইনিংসে তার গড় ৯.৭২, স্ট্রাইক রেট ৯২.২৪। সবশেষ ১৪ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে কোনো ফিফটির দেখা নেই। দ্রুত দায়িত্ব পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, মাঠের পারফরম্যান্স সেই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করেছে।
টানা ব্যর্থতায় এক ম্যাচে তাকে একাদশের বাইরে রেখেছিল ঢাকা ক্যাপিটালস। অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন তখন জানিয়েছিলেন, মানসিক চাপ কমানোর জন্যই এই বিরতি। কিন্তু বিরতির পরও ব্যাটে ফিরেনি স্বস্তি। বরং আত্মবিশ্বাসের সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে।
প্রধান কোচ গোলাম মোর্তজা অবশ্য এখনো আশার আলো দেখছেন। তার মতে, অনুশীলনে সাইফের শট নির্বাচন ও টাইমিং ছিল চমৎকার। নেটে নিয়মিতই ভালো ব্যাট করছিলেন তিনি। কোচের বিশ্বাস, সাইফ বাংলাদেশের ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, যিনি যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। দল ব্যবস্থাপনাও বিশ্বকাপের আগে তাকে আত্মবিশ্বাস দিতে চেয়েছে সবসময়।
তবু বাস্তবতা নির্মম। টুর্নামেন্ট প্রায় শেষ, কিন্তু সাইফের ব্যাটে কাঙ্ক্ষিত জাগরণ দেখা যায়নি। ঢাকা ক্যাপিটালসের সামনে এখন আর হারানোর কিছু নেই, আর সাইফ হাসানের সামনে সুযোগ মাত্র একটি।
রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম রয়্যালসের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে মাঠে নামবে ঢাকা ক্যাপিটালস। সেই ম্যাচে সাইফ যদি কিছু রান করতে পারেন, তাহলে তা হয়তো পরিসংখ্যানের বড় পরিবর্তন আনবে না। তবে মানসিক দিক থেকে সেটাই হতে পারে তার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় একটি ইনিংস।










Discussion about this post