স্বপ্নের মতো এক দিন! অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ।
আজ মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বৃষ্টি আইনে ৫ উইকেটের জয় তুলে নেয় মেহেদী হাসান মিরাজের দল। এর ফলে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই ২-০ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নেয় স্বাগতিকরা। দীর্ঘ ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ।
ম্যাচের শুরুতেই বাংলাদেশের বোলাররা বুঝিয়ে দেন, দিনটি তাদের হতে যাচ্ছে। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া যেন দুঃস্বপ্নের শুরু দেখে। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই হারিয়ে ফেলে তিনটি উইকেট। ওয়ানডে ক্রিকেটে ১০২৪ ম্যাচের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শূন্য রানে তিন উইকেট হারানোর বিব্রতকর রেকর্ড গড়ে সফরকারীরা।
প্রথম আঘাত হানেন তাসকিন আহমেদ। সিরিজে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ম্যাথু শর্টকে ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর মুস্তাফিজুর রহমানের এক ওভারে সাজঘরের পথ ধরেন কুপার কনোলি ও ম্যাট রেনশ। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে বাংলাদেশের হাতে।
চাপের মুখে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস কিছুটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন অ্যালেক্স ক্যারি। তবে বাংলাদেশের বোলাররা কাউকেই থিতু হতে দেননি। ১৮তম ওভারে তানভীর ইসলামের বলে আউট হন অধিনায়ক জশ ইংলিস। তখন অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ৮১ রান, হারিয়েছে ৬ উইকেট।
সেখান থেকে জেভিয়ার বার্টলেট ও মার্নাস লাবুশেন দলের হাল ধরেন। সপ্তম উইকেটে ১০৩ রানের জুটি গড়ে তারা ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেন। কিন্তু ইনিংসের শেষ দিকে আবারও বাংলাদেশি বোলারদের আঘাতে থেমে যায় অস্ট্রেলিয়ার অগ্রযাত্রা। তাসকিনের গুরুত্বপূর্ণ দুই উইকেটের পর ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রানেই থামে সফরকারীদের ইনিংস।
এরপর বৃষ্টি নামলে কিছু সময়ের জন্য খেলা বন্ধ থাকে। দীর্ঘ বিরতির পর ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ৪১ ওভারে ১৯২ রান।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশেরও। প্রথম ওভারেই আউট হন তানজিদ হাসান তামিম। তবে এরপর সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত মিলে গড়ে তোলেন জয়ের ভিত্তি। দ্বিতীয় উইকেটে তাদের ৮৬ রানের জুটি ম্যাচকে বাংলাদেশের দিকে নিয়ে আসে।
সৌম্য সরকার ৪২ রান করে বিদায় নিলেও তার ইনিংস ছিল প্রয়োজনীয়। একই স্কোরে আউট হন শান্তও। তবে আউট হওয়ার আগে তিনি স্পর্শ করেন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ওয়ানডে ক্রিকেটে দুই হাজার রান পূর্ণ করে বাংলাদেশের ১১তম ব্যাটার হিসেবে নাম লেখান এই বাঁহাতি ব্যাটার। একই সঙ্গে এটি ছিল বাংলাদেশের হয়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম দুই হাজার রানের কীর্তি।
এরপর লিটন দাস ও মোসাদ্দেক হোসেন কিছুটা এগিয়ে নিলেও দুজনই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। লিটন ২১ রান করে ক্যামেরন গ্রিনের বলে আউট হন। আর মোসাদ্দেক আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে গিয়ে অ্যাডাম জাম্পার শিকার হন। ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ কিছুটা চাপে পড়ে গেলেও ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
শেষ দিকে দায়িত্ব নেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাওহিদ হৃদয়। ধৈর্য আর পরিণত ব্যাটিংয়ে তারা দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। ৩৫ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। সঙ্গে নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক সিরিজ জয়।
বাংলাদেশের এই সাফল্যের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বোলারদের। তাসকিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান নেন তিনটি করে উইকেট। তানভীর ইসলাম যোগ করেন দুটি উইকেট। নতুন বল হাতে তাদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংই মূলত ম্যাচের ভিত্তি গড়ে দেয়।
এই জয় কেবল একটি ম্যাচ বা একটি সিরিজ জয়ের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের আরেকটি মাইলফলকের নাম। যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একসময় লড়াই করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সেই দলকেই এখন সিরিজ হারানোর সামর্থ্য দেখিয়েছে টাইগাররা। আর তাই ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনের দিনেও বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে উজ্জ্বল খবর হয়ে উঠেছে মিরপুরে লেখা এই নতুন ইতিহাস।
এখন সামনে ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচ। ১৪ জুন মাঠে নামবে দুই দল। সিরিজ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের হাতে। তবে সেই ম্যাচে জিততে পারলে ইতিহাসের পাতায় আরও বড় করে নাম লেখানোর সুযোগ অপেক্ষা করছে মিরাজদের সামনে।









Discussion about this post