বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে আজ একটি অস্বস্তিকর অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর্দা উঠলেও সেখানে নেই বাংলাদেশের নাম। ১৯৯৯ সাল থেকে টানা প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলটি এবার ২৬ বছর পর প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চের বাইরে। বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে, কিন্তু লাল-সবুজের গর্জন ছাড়াই-যা শুধু একটি দলের অনুপস্থিতি নয়, বরং কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর আবেগে বড় ধরনের আঘাত।
এই বিশ্বকাপ এমন এক সময়ে শুরু হচ্ছে, যখন মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে মাঠের বাইরের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। ভারত ও পাকিস্তানের চিরাচরিত রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নতুন নয়, কিন্তু এবারের আসরে সেই দ্বন্দ্বে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশও। ফলে পুরো টুর্নামেন্টটাই যেন ক্রিকেটীয় উত্তেজনার বদলে অনিশ্চয়তার গল্পে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ বাছাইপর্ব পেরিয়েই বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছিল। পারফরম্যান্স বা যোগ্যতার প্রশ্নে দলটি কোথাও পিছিয়ে ছিল না। তবুও শেষ মুহূর্তে নিরাপত্তা শঙ্কা ও কূটনৈতিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশের নাম কেটে দেওয়া হয়। আইসিসির সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হলেও কোনো সমাধান আসেনি। বাংলাদেশের অনড় অবস্থান এবং আইসিসির সিদ্ধান্ত-এই দুইয়ের সংঘাতে সবচেয়ে সহজ পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হয় বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তার জায়গায় সুযোগ পায় স্কটল্যান্ড।
এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপকে শুধু বিতর্কিতই করেনি, বরং আলোচনার রংও বদলে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় ক্রিকেট বাজার বাংলাদেশ। টেলিভিশন রেটিং, ডিজিটাল ভিউ, বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশিপ-সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের উপস্থিতি মানে বাড়তি আকর্ষণ। সেই জায়গায় শূন্যতা তৈরি হওয়ায় বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক ভারসাম্যও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের অনুপস্থিতির ছায়া আরও ঘন হয়েছে ভারত-পাকিস্তান ইস্যুকে ঘিরে। বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয়, যা টুর্নামেন্টকে ঠেলে দেয় আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ কেবল একটি খেলা নয়; এটি বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক পণ্য। শত শত কোটি টাকার বিজ্ঞাপন, সম্প্রচার ও স্পনসর বিনিয়োগ এই একটি ম্যাচের ওপর নির্ভরশীল। সেই ম্যাচ না হলে ক্ষতির অঙ্ক যেমন ভয়াবহ, তেমনি টুর্নামেন্টের গ্রহণযোগ্যতাও বড় প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা, আইসিসি, সম্প্রচার সংস্থা, স্পনসর, পর্যটন খাত-সবাই এখন হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। যে বিশ্বকাপ ঘিরে অর্থনীতির বিশাল চাকা ঘোরার কথা ছিল, সেখানে সেই চাকার গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট।
বিশ্ব ক্রিকেটের বাস্তবতা হলো, এই খেলাটির অর্থনীতি কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ-এই তিন দেশের দর্শক ও বাণিজ্যিক শক্তিই দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল চালিকাশক্তি। সেখানে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি এবং পাকিস্তানের সীমিত অংশগ্রহণ পুরো কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আইসিসির জন্য এটি কেবল একটি টুর্নামেন্ট পরিচালনার সংকট নয়, বরং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার বড় পরীক্ষা।
বিশ্বকাপের সূচি অনুযায়ী আজ উদ্বোধনী ম্যাচগুলো দিয়ে শুরু হবে প্রতিযোগিতা। প্রথম পর্ব, সুপার এইট ও নকআউট পেরিয়ে ৮ মার্চ ট্রফি উঠবে চ্যাম্পিয়নের হাতে।










Discussion about this post