কাউন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পদচারণা খুব বেশি পুরোনো নয়। তবে যারা সুযোগ পেয়েছেন, তাদের অনেকেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ রেখেছেন ইংল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে। সেই তালিকায় এবার জোরালোভাবেই নিজের নাম লিখিয়ে ফেললেন হাসান মাহমুদ। কেন্টের জার্সিতে প্রথম ম্যাচ খেলেই দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট শিকার করেছেন বাংলাদেশের এই পেসার। শুধু তাই নয়, দুর্দান্ত বোলিংয়ে দলকে ১৪০ রানের বড় জয় এনে দিয়ে হয়েছেন ম্যাচসেরাও।
লাল বলের কাউন্টি ক্রিকেটে দ্বিতীয় বাংলাদেশি এবং সবমিলিয়ে চতুর্থ বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে নামেন হাসান। অভিষেক ম্যাচের প্রথম ইনিংসে তিন উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন তিনি। ফাইফারসহ শিকার করেন ছয় উইকেট। ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে এমন পারফরম্যান্স যে কোনো পেসারের জন্যই বিশেষ অর্জন, আর সেটি এসেছে তার প্রথম ম্যাচেই।
তবে কেন্টের সঙ্গে এই অধ্যায় আপাতত খুব দীর্ঘ হচ্ছে না। মিডলসেক্সের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলার পরই জাতীয় দলের দায়িত্বে যোগ দিতে জিম্বাবুয়ে উড়াল দেবেন তিনি। সেখানে বাংলাদেশের হয়ে একটি টেস্ট খেলবেন। এরপর আগস্টে অস্ট্রেলিয়া সফরের টেস্ট সিরিজেও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে তার। তবে জাতীয় দলের ব্যস্ততা শেষ করেই আবার ইংল্যান্ডে ফিরবেন বলে নিশ্চিত করেছেন এই পেসার।
কেন্ট ক্রিকেট ক্লাব আয়োজিত এক সাক্ষাৎকারে হাসান বলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি সেপ্টেম্বরে আবার ফিরব এবং বাকি চারটা ফার্স্ট-ক্লাস ম্যাচ খেলব।’
প্রথম ম্যাচের সাফল্যের পর কেন্ট শিবিরেও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। দলের পরিবেশ নিয়েও সন্তুষ্ট বাংলাদেশের এই পেসার। হাসান বলেন, ‘হ্যাঁ, সব ছেলেরা পরের ম্যাচে খুব আত্মবিশ্বাসী। হোম গ্রাউন্ডে জয়ের জন্য উত্তেজিত।’
কাউন্টি ক্রিকেটে অভিষেকের অভিজ্ঞতা যে তার জন্য রোমাঞ্চকর ছিল, সেটিও লুকাননি তিনি। হাসান বলেন, ‘খুবই এক্সাইটেড। অনেক দর্শক আসছে। যদি আমি আমার সেরা বোলিং করতে পারি, উইকেট বেশি নিতে পারি, দলকে জয় দিতে পারি-এটা আমার জন্য খুব ভালো।’
অভিষেক ম্যাচেই পাঁচ উইকেট পাওয়া নিয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ফাস্ট বোলারের কাছে প্রথম ম্যাচে পাঁচ উইকেটের হল স্বপ্নের মতো। এখানে এমন অনুভব করা খুবই অসাধারণ যে আমি কীভাবে বল করছি, এবং দলের জন্য আমি যতটা সম্ভব ভালো করছি। এটি ছিল অসাধারণ।’
শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, কেন্টের ড্রেসিংরুমের পরিবেশও মুগ্ধ করেছে হাসানকে। বিশেষ করে দলের অধিনায়ক ড্যানিয়েল বেল-ড্রামন্ডের কাছ থেকে অভিষেক ক্যাপ পাওয়ার মুহূর্তটি তার কাছে ছিল বিশেষ গর্বের।
অধিনায়ক সম্পর্কে হাসান বলেন, “তিনি তার অসাধারণ ব্যাটিং করেন, খুব ভালো খেলোয়াড় এবং বছরের পর বছর কেন্টকে সার্ভ করছেন। তার কাছ থেকে অভিষেক ক্যাপ পাওয়ার আনন্দের ব্যাপার। তিনি ভালো মানুষ এবং ম্যাচে আমাকে সবসময় ব্যাকআপ দেন এবং খুবই সমর্থন দেন।’
অভিষেকের মুহূর্তটি স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, ‘রিং-এ সবাই করতালি দিচ্ছিল। তাই এটা ছিল এক অসাধারণ অনুভূতি। এখান থেকে অভিষেক হওয়ার পর দলের জন্য দায়িত্ব আসে। তারপর ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত খেলে দলের জন্য জয় নিশ্চিত করতে হয়।’
ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে সবচেয়ে বেশি কী উপভোগ করছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে হাসানের উত্তর ছিল ডিউক বল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোকাবুরা বলে অভ্যস্ত এই পেসার ইংল্যান্ডে এসে নতুন অভিজ্ঞতায় মুগ্ধ, ‘ডিউক বল দিয়ে বল করা, এটা সত্যিই বিশেষ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোকোবরাই বল করতাম। এখানে ডিউক বল পেয়েছি, বিভিন্ন সারফেস ও কন্ডিশনে- এতে আমি অনেক এক্সাইটেড ও খুশি।’
ম্যাচে নেওয়া ৯ উইকেটের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে, সেটিও জানিয়েছেন হাসান। তার পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইংল্যান্ডের আন্তর্জাতিক তারকা লিয়াম লিভিংস্টোনের উইকেট।
হাসান বলেন, ‘কয়েকটা পেয়েছি, কিন্তু আমি বলব লিভিংস্টোনের উইকেটটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে। আমি তাকে দুইবার আউট করেছি। এটা ছিল অসাধারণ। তিনি ইংল্যান্ড দলে খেলেন।’
কাউন্টি অভিষেকে আরেকটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি পেসার জেমস অ্যান্ডারসনের বিপক্ষে খেলা। যদিও ম্যাচ চলাকালে তার সঙ্গে আলাপের সুযোগ হয়নি বলে জানান হাসান, ‘না, ম্যাচের সময় কথা বলার সুযোগ পাইনি। শুধু ম্যাচ শেষে হাত মেলানো হয়েছে। কারণ তাকে বিরক্ত করতে চাইনি। তিনি তাড়াহুড়োয় ছিলেন। পরবর্তী বার হবে।’
ব্যস্ত সূচির মাঝে ছুটির দিনে ঘোরাঘুরি নয়, বরং বিশ্রামকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি, ‘না। আগের দিন গিয়েছিলাম। বাইরে বেরোনোর সময় ছিল না। শুধু রুমে চিললাউট করেছি।’
কাউন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে হাসান মাহমুদ শুধু ভালো খেলেননি, নিজের সামর্থ্যেরও শক্ত বার্তা দিয়েছেন। অভিষেক ম্যাচেই ৯ উইকেট, ম্যাচসেরা পুরস্কার, দলের বড় জয় এবং ইংলিশ কন্ডিশনে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা-সব মিলিয়ে তার শুরুটা হয়েছে স্বপ্নের মতো!










Discussion about this post