একসময় অস্ট্রেলিয়া সফর মানেই ছিল বাংলাদেশের জন্য কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। প্রতিপক্ষের গতি, বাউন্স আর আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের সামনে টিকে থাকাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের মানসিকতাও। এখন অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের মুখে শুধু লড়াইয়ের কথা নয়, শোনা যাচ্ছে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নও।
দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবারও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী আগস্টে ডারউইন ও ম্যাকাইয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের একমাত্র টেস্ট জয়টি এসেছিল ২০১৭ সালে মিরপুরে। তবে এবার স্বপ্নটা আরও বড়।
ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়ের কথাতেই ফুটে উঠেছে সেই আত্মবিশ্বাস। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সবারই আশা থাকে অস্ট্রেলিয়ায় খেলার, এবং অস্ট্রেলিয়ায় যদি আমরা একটা টেস্ট জিততে পারি, তাহলে এটা ইতিহাস হয়ে থাকবে।’
বাংলাদেশ দলের এই আত্মবিশ্বাস হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের বদলে ফেলেছে দলটি। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠ ও বিদেশের মাটিতে টানা সাফল্য দলের ভেতরে নতুন বিশ্বাস তৈরি করেছে। জয় মনে করেন, এই অর্জন ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জের জন্য দলকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করেছে।
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান সিরিজ থেকে আত্মবিশ্বাস অবশ্যই আমাদের দলকে অনেক অনুপ্রাণিত করবে, কারণ ওদের দেশে গিয়ে আমরা ওদের সাথে দুইটা টেস্ট জিতেছি এবং এবার আমরা আমাদের মাটিতে ওদের সাথে দুইটা টেস্ট জিতেছি। এটা আমাদের পরবর্তী টেস্ট সিরিজের জন্য খুবই উৎসাহ জোগাবে।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে উইকেটের ধরনে। আগে যেখানে ধীর ও টার্নিং উইকেটের ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি, সেখানে এখন দেশের মাটিতেও দেখা যাচ্ছে বাউন্স ও গতির উইকেট। ব্যাটাররা রান পাচ্ছেন, বোলাররাও সুযোগ তৈরি করছেন। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখছেন জয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেন গত ৪-৫টা সিরিজ যখন আমরা দেশের মাটিতে খেলেছি, খুব ভালো স্পোর্টিং উইকেট ছিল। বাউন্স খুব ভালো ছিল, উইকেটে রান হয়েছে, বোলারেরাও উইকেট নিয়েছে। সুতরাং এটা খুব ইতিবাচক দিক যে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে যদি এই ধরনের উইকেট পাই, আমাদের জন্য খুব ভালো হবে।’
বাংলাদেশ এখন নিজেদের যেকোনো দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো পর্যায়ে দেখছে। জয়ের বিশ্বাস, ব্যাটিং ইউনিট বড় সংগ্রহ গড়তে পারলে বোলাররা অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলকেও চাপে ফেলতে পারবেন।
জয় বলেন, ‘এখন আমরা যে পর্যায়ে আছি, আমরা কিন্তু যেকোনো দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতোই সক্ষম। আমরা যদি ব্যাটসম্যানরা স্কোরবোর্ডে ভালো রান তুলতে পারি, তাহলে আমাদের যে মানসম্মত বোলার আছে, ওরা যেকোনো প্রতিপক্ষকে কঠিন সময়ের মুখোমুখি করতে পারবে।’
অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি নিয়েও ভাবতে শুরু করেছে বাংলাদেশ দল। ঈদের পর টেস্ট ক্রিকেটারদের নিয়ে বিশেষ ক্যাম্প করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে বাড়তি বাউন্স ও দ্রুতগতির উইকেটের অনুশীলনে জোর দেওয়া হবে।
জয় বলেন, ‘আমাদের হয়ত ঈদের পরে টেস্ট দলকে নিয়ে একটা অনুশীলন ক্যাম্প থাকবে। সেখানে কোচরা যে পরিকল্পনা দেবেন, সেই অনুযায়ী কাজ করব। সেখানে হয়ত বাড়তি কিছুটা বাউন্স থাকবে, ওই প্রস্তুতিটা হয়ত আমরা এখানেই নেওয়ার চেষ্টা করব আরকি।’
ড্রেসিংরুমের পরিবেশেও এখন আত্মবিশ্বাস ও সমর্থনের আবহ দেখছেন জয়। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে ক্রিকেটাররা নিজেদের স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছেন বলেও মনে করেন তিনি।
জয়ের ভাষায়, ‘উনি (শান্ত) সবসময় খুব সাপোর্টিভ। যেমন আমি গত তিনটা ইনিংসে রান করতে পারি নাই, উনি আমাকে সবসময় বলেছেন যে, ‘তুই খেলবি, তুই ভালো করে খেল, রান কর, স্বাধীনভাবে খেল।’ উনি সবাইকে খুব সমর্থন করেন, খুবই সহায়ক।’
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিং নিয়েও আলাদা প্রস্তুতি নিচ্ছেন ক্রিকেটাররা। সিলেট টেস্টে শর্ট লেগে শান মাসুদের ক্যাচ নেওয়ার মুহূর্তটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জয় জানান, এর পেছনে ছিল দীর্ঘ অনুশীলন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ এখনও শুরু হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে যে আত্মবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে, সেটি সাম্প্রতিক সময়ের যেকোনো সফরের চেয়ে আলাদা। এবার হয়তো টাইগাররা শুধু প্রতিপক্ষকে চমকে দিতেই নয়, নিজেদের নতুন ইতিহাস লিখতেও নামবে মাঠে।









Discussion about this post