মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ঘূর্ণি উইকেট তৈরি করা যেন এখন এক প্রচলিত রীতি। প্রতিপক্ষকে কাবু করতে স্পিনের জাল বিছানো- বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের দীর্ঘদিনের কৌশল। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই কৌশলই মাঝে মাঝে হয়ে ওঠে নিজেদের বিপদের কারণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সেই পুরোনো দৃশ্যই আবার ফিরে এল- নিজেদের পাতা ঘূর্ণির ফাঁদেই পড়ে গেল বাংলাদেশ।
‘কালো উইকেট’-সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ। টিভি স্ক্রিনে তাকালে বোঝা যাচ্ছিল, পিচের রঙ এমন গাঢ় যে মনে হচ্ছিল সম্প্রচারেই বুঝি সমস্যা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি স্পিনার আকিল হোসেন পর্যন্ত ম্যাচ শেষে হেসে বললেন, ‘প্রথমে টিভি চালু করে ভেবেছিলাম, হয়তো স্ক্রিন নষ্ট! পরে বুঝলাম, পিচটাই এমন কালো।’
এই কালো মাটির পিচে মূলত পরিকল্পনা ছিল প্রতিপক্ষকে ঘুরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু ম্যাচের শেষে দেখা গেল, সেই ঘূর্ণিতেই কাবু হলো বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ক্যারিবীয়রা ইতিহাস সৃষ্টি করে- ওয়ানডে ক্রিকেটের ৫২ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরো ৫০ ওভারই স্পিনারদের দিয়ে বল করায় তারা। খারি পিয়ের, গুড়াকেশ মতি, আকিল হোসেন, রস্টন চেজ আর পার্টটাইমার অ্যালিক আথানেজ- এই পাঁচ স্পিনারই ১০ ওভার করে বোলিং করেছেন।
অ্যালিক আথানেজ, যিনি ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এর আগে মাত্র দুবার বল করেছিলেন (মোট ৪ ওভার), এবার পুরো কোটার ১০ ওভার শেষ করে ফেলেন, তুলে নেন দুই উইকেট, দেন মাত্র ১৪ রান। তার স্পিনেই কাবু হয়ে একের পর এক ব্যাটার ফেরেন সাজঘরে। বাংলাদেশের ব্যাটিং এমন বেহাল যে ২০০ রানও তখন অসম্ভব মনে হচ্ছিল। শেষদিকে রিশাদ হোসেনের ঝড়ো ৩৯ রানের ইনিংসে কোনোমতে ২০০ পেরোয় স্কোরবোর্ড।
কিন্তু সেটিও যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশের বোলাররা যখন নিজেদের স্পিন কৌশলে ম্যাচটিকে প্রায় জয়ের মুখে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই হাল ধরেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক শাই হোপ। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ৫৩ রানে ম্যাচ টাই করিয়ে দেন তিনি। পরে সুপার ওভারে আবারও মূল চরিত্র আকিল হোসেন- বল হাতে জাদু দেখিয়ে বাংলাদেশকে ৯ রানেই আটকে দেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো- এই আকিলকে জরুরি ভিত্তিতে আগের দিন রাতে ঢাকায় উড়িয়ে আনা হয়। তিনি বাংলাদেশে পৌঁছান ভোর চারটায়, হোটেলে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই বিকেলে মাঠে নেমে ১০ ওভারে ২ উইকেট নেওয়ার পর সুপার ওভারে ম্যাচ জেতান। ম্যাচ শেষে বলেন, ‘যখন কোনো কিছুর প্রতি প্রতিশ্রুতি থাকে, তখন ক্লান্তি বলে কিছু থাকে না। আজ দলকে জেতাতে পেরেছি, সেটাই সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ শিবিরে ম্যাচের পর প্রশ্ন উঠেছে কৌশল কি ভুল ছিল? স্পিনের সহায়ক উইকেট বানিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চেয়ে উল্টো নিজেদের ঘায়েল করেছে বাংলাদেশ? মাঠের পারফরম্যান্স তাই বলছে। দলের তিন প্রধান স্পিনার- তানভীর ইসলাম, নাসুম আহমেদ ও রিশাদ হোসেন- শেষ দুই ওভারের আগেই নিজেদের কোটার ৩০ ওভার শেষ করে ফেলেন। এমনকি মোস্তাফিজুর রহমানের দুই ওভার তখনও হাতে ছিল, কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে তা ব্যবহৃত হয়নি।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সৌম্য সরকার অবশ্য বিষয়টি নাকচ করে দেন, ‘ওরাও স্পিন বল করছে, আমরাও স্পিন বল করছি। হোপ ভালো ব্যাট করেছে, ওরাই আজ ভালো ক্রিকেট খেলেছে, তাই জিতেছে। প্রথম ইনিংসের তুলনায় দ্বিতীয় ইনিংসে কুয়াশার কারণে ব্যাটিং সহজ হয়ে গিয়েছিল।’
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। উইকেটের প্রকৃতি, দলের পরিকল্পনা আর প্রতিপক্ষের সঠিক পাঠ- সবকিছু মিলে স্পষ্ট হয়ে গেছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বুঝে ফেলেছে কিভাবে বাংলাদেশকে তাদেরই অস্ত্র দিয়ে হারানো যায়।
আগামীকাল মিরপুরেই সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে। যেখানে যারা জিতেব সিরিজ তাদেরই!










Discussion about this post