মিরপুরের রাতটা ছিল অন্যরকম। গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো দর্শক বুঝতে পারছিলেন, তারা হয়তো ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছেন। মাঠের ভেতরে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষায় ছিল আত্মবিশ্বাস, চোখে ছিল জয়ের ক্ষুধা। আর মাঠের অন্য পাশে অস্ট্রেলিয়া, বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটি—ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল বাংলাদেশের চাপে!
শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান হলো। ২১ বছর পর ওয়ানডেতে আবারও অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে জয়। মিরপুর শের-ই বাংলা স্টেডিয়ামের এই রাত তাই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ জায়গা নিয়েই থাকবে।
এই জয়ের কেন্দ্রে ছিলেন একজন মানুষ-মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। দীর্ঘ প্রায় চার বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরে তিনি যেন নতুন করেই নিজের গল্প লিখলেন। ব্যাট হাতে অপরাজিত ৮৬ রান, পরে বল হাতে দুই উইকেট-পুরো ম্যাচে তার পারফরম্যান্স ছিল এক কথায় অসাধারণ।
বাংলাদেশের ইনিংস শুরু হয়েছিল ধাক্কা দিয়ে। দ্রুত সাইফ হাসানের উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা। তবে সেই চাপ খুব বেশি সময় স্থায়ী হতে দেননি তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে থাকেন দুজন।
তামিমের ব্যাটিং ছিল দারুণ আত্মবিশ্বাসী। কাট, পুল আর ড্রাইভে অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের চাপে ফেলেন তিনি। অন্যদিকে শান্ত ছিলেন আরও পরিণত। ইনিংস গড়ার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই খেলেছেন আক্রমণাত্মক শট। দুজনের ৯৬ রানের জুটি বাংলাদেশকে এনে দেয় শক্ত ভিত।
তবে ক্রিকেটের পরিচিত নিয়ম মেনেই হঠাৎ ছন্দপতন। কয়েক ওভারের ব্যবধানে ফিরে যান তামিম, লিটন ও শান্ত। স্কোরবোর্ডে তখন রান থাকলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ফিরে পেতে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া।
ঠিক সেই সময় সামনে আসেন মোসাদ্দেক। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকার হতাশা যেন জমা ছিল তার ব্যাটে। শুরুতে ধীরে খেললেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হয়ে ওঠেন ভয়ংকর। স্পিনারদের বিপক্ষে রিভার্স সুইপ, পেসারদের বিপক্ষে সোজা ব্যাটের নিখুঁত শট—সব মিলিয়ে তিনি খেলেন আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটের পরিপূর্ণ ইনিংস।
একবার অবশ্য জীবন পান। সহজ একটি ক্যাচ ফেলেন কুপার কনোলি। সেই ভুলের মাশুল পরে পুরো দলকেই দিতে হয়েছে। কারণ এরপর মোসাদ্দেক আর থামেননি।
তাওহিদ হৃদয় ধৈর্য ধরে তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। পরে তাসকিন আহমেদের ছোট কিন্তু কার্যকর ইনিংস বাংলাদেশের রানকে নিয়ে যায় লড়াকু সংগ্রহে। শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভারে ২৮৪ রান তোলে স্বাগতিকরা।
তবে ম্যাচের আসল রূপ বদলে যায় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং শুরু হতেই।
প্রথম বলেই তাসকিন আহমেদের আঘাত। ম্যাট শর্টকে বোল্ড করে বাংলাদেশের গ্যালারিতে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেন তিনি। পরের ওভারে মোস্তাফিজুর রহমান ফিরিয়ে দেন মার্নাস লাবুশেনকে। দুই ওভারের মধ্যেই চাপে পড়ে যায় সফরকারীরা।
এরপর কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করেছিলেন জশ ইংলিস, কুপার কনোলি ও অ্যালেক্স কেয়ারি। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা সেদিন যেন অন্য এক মিশনে নেমেছিলেন।
বিশেষ করে নাহিদ রানা ছিলেন দুর্দান্ত। তার গতি, বাউন্স আর আগ্রাসী লাইন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। ইংলিসকে গতির ঝড়ে কট বিহাইন্ড করানোর পর কেয়ারিকেও ফিরিয়ে দেন তিনি। পরে আরও দুটি উইকেট নিয়ে শেষ করেন চার উইকেট শিকার করে। ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটিই সেরা বোলিং।
মোসাদ্দেকও বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভেঙেছেন জুটি। কনোলি ও ম্যাট রেনশকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে দেন তিনি।
একসময় স্কোরবোর্ডে ১৪০ রানে ৮ উইকেট। তখন পুরো মিরপুর বুঝে গেছে, ইতিহাস খুব কাছেই। পরে বৃষ্টি এসে ম্যাচ থামিয়ে দেয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশকে ৮৬ রানের জয়ী ঘোষণা করা হয়।
বৃষ্টি নামার আগেই অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার ওপর ঝড় নামিয়েছিল বাংলাদেশ।
এই জয় কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি আত্মবিশ্বাসের জয়, প্রত্যাবর্তনের জয়, আর নিজেদের সামর্থ্য নতুন করে প্রমাণ করার জয়। কার্ডিফে একসময় যে স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, মিরপুরে এসে তার নতুন অধ্যায় লেখা হলো!










Discussion about this post