বিপিএলের দ্বাদশ আসর শুরুর আগেই যে দলটি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল, সেই চট্টগ্রাম রয়্যালস প্রথম ম্যাচেই দেখাল কেন তাদের দিকে এত দৃষ্টি। আর্থিক সংকট, মালিকানা ছাড়ার নাটকীয় সিদ্ধান্ত আর বিসিবির সরাসরি তত্ত্বাবধানে নামার পর উদ্বোধনী দিনেই নোয়াখালী এক্সপ্রেসকে ৬৫ রানে হারিয়ে আসর শুরু করল শেখ মেহেদি হাসানের নেতৃত্বাধীন দলটি।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আলোচনার একপর্যায়ে উঠে আসে ‘কমিটির দল’ প্রসঙ্গ। প্রশ্নটি শুনে এক মুহূর্ত থেমে যান চট্টগ্রাম অধিনায়ক।
এরপর হাসতে হাসতেই বলেন, ‘দেখুন, কমিটির দল এটা তো আমরা এলাকাগত ব্যাপার জানি, এখানে কমিটির দল কীভাবে বলব (হাসি)… খেলা সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে, কমিটির দল থাকলেও লাভ নেই আসলে।” যেন কেউ কথাটিকে ভুলভাবে না নেয়, সেটিও পরিষ্কার করে দেন তিনি, “জাস্ট ফান করে বলেছেন, ঠিক আছে।’
পাড়া-মহল্লার টুর্নামেন্টে আয়োজকদের দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব নিয়ে যে রসিকতা চলে, সেই ধারণাই যেন এবার বিপিএলের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। কারণ এই প্রথম বিসিবির আয়োজিত টুর্নামেন্টেই খেলছে বিসিবির পরিচালনায় থাকা একটি দল। ফলে মাঠের বাইরের গল্পে চট্টগ্রাম রয়্যালস ছিল পুরো আসরের সবচেয়ে আলোচিত ফ্র্যাঞ্চাইজি।
টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগের দিন মালিকপক্ষ দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় তৈরি হয় বড় অনিশ্চয়তা। বিসিবি দ্রুত দায়িত্ব নিয়ে কোচিং স্টাফ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনে। কিন্তু সেই অস্থিরতার প্রভাব যে ক্রিকেটারদের ওপর পড়েছিল, তা স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি শেখ মেহেদি হাসান। তিনি বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা যদি ভালো না থাকে, ক্রিকেটাররা তো একটু… আমরা যেহেতু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার, এই পরিবেশনটা তো… মূলত এরকম পরিবেশ কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজিতে আমি পাইনি। আমার জন্য কঠিন ছিল।’
তবু মাঠে নামার পর পেশাদারিত্বই ছিল চট্টগ্রামের মূল শক্তি। অধিনায়কের ভাষায়, ‘পরিস্থিতি যেমনই হোক, খেলার ভেতর ঢুকলে তো সবটুকু প্রচেষ্টা থাকবে খেলা নিয়ে। এরকমই ছিল আমাদের। চেষ্টা ছিল, মাঠে ঢুকলে যেন আমরা সবাই যথাযথ তাড়না দেখাতে পারি। যতই ঝড়-তুফান যাক না কেন, খেলা তো মাঠের ভেতরে। আপনি যখন ২২ গজে ঢুকবেন, মানসিকতা তখন খেলার জন্যই থাকবে।’
এই কঠিন সময়ের মধ্যেও ইতিবাচক দিক দেখছেন শেখ মেহেদি। তার মতে, ‘এটা একটু কঠিন ছিল, তবে যেটা বললাম, দিনশেষে ক্রিকেট খেলা। আমরা তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিয়েছি, এটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ক্রিকেটার হিসেবে স্বস্তির একটা ব্যাপার থাকে। এটা খেলার ভেতরে (টুর্নামেন্ট চলার সময়) হতে পারত। খেলা শুরুর আগেই সমাধান হওয়ায় ক্রিকেটারদের জন্য ভালো হয়েছে।’ আরও বলেন, ‘খেলার মাঝপথে এমন একটি দুর্ঘটনা হতে পারত। খেলা শুরুর আগেই শেষ হয়ে গেছে এটা। সবাই এখন ফ্রেশ আছে। কারও ওপর চাপ নেই, মানসিকভাবে ফ্রি আছে।’
মাঠের পারফরম্যান্সেও চট্টগ্রামের জয় ছিল ব্যতিক্রমী। চার বিদেশি খেলানোর সুযোগ থাকলেও প্রথম ম্যাচে একাদশে ছিলেন মাত্র দুজন বিদেশি, তাও তারা দুজনই তুলনামূলকভাবে অপরিচিত। পাকিস্তানের মির্জা তাহির বেগ খেলেন দুর্দান্ত ৮০ রানের ইনিংস, যা তাকে ম্যাচসেরার পুরস্কার এনে দেয়। অন্যদিকে আফগানিস্তানের মাসুদ গুরবাজ ব্যাটিংয়ের সুযোগ না পেলেও উইকেটের পেছনে দুটি ক্যাচ নেন।
সামনের ম্যাচগুলোতে দল আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছেন অধিনায়ক। তিনি বলেন,‘আশা করি, পরের ম্যাচ থেকে আমরা চারজন বিদেশি নিয়ে খেলতে পারব। তাহলে দলের ব্যালান্স আরও ভালো হবে। তবে এটা তো আমাদের হাতে নেই। বর্তমানে যারা অফিসিয়াল আছেন, তারা হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’
এই বিপিএল শেখ মেহেদির জন্য ব্যক্তিগতভাবেও নতুন অভিজ্ঞতা। বড় মঞ্চে প্রথমবার অধিনায়কত্ব করছেন তিনি। সেই অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ’অধিনায়কত্ব আমার জন্য একদমই নতুন। ভালো পর্যায়ের ক্রিকেটে কখনোই সম্ভবত অধিনায়কত্ব করিনি। এটা আমার প্রথম ছিল। একটু রোমাঞ্চিতও ছিলাম। সব মিলিয়ে ভালো লাগছে।’
নিজের প্রথম ম্যাচেই তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্যাট হাতে ১৩ বলে ২৬ রান এবং বল হাতে চার ওভারে ১৭ রান দিয়ে দুটি উইকেট নিয়ে অধিনায়কত্বের অভিষেক রাঙান। ম্যাচ শেষে তিনি জানান, নেতৃত্বের পথে তিনি এখনো শিখছেন, ’আমি এখনও শিখছি (অধিনায়কত্ব)। আমার নেতৃত্বে এটিই প্রথম বিপিএল ম্যাচ। অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচ আমি খেলেছি। সিনিয়র ক্রিকেটার রিয়াদ ভাই, সাকিব ভাই, তামিম ভাই, মুশি ভাইদের সঙ্গে খেলেছি এবং তাদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছি।’
সব মিলিয়ে মাঠের বাইরে যত অস্থিরতা আর বিতর্কই থাকুক, মাঠের ভেতরে প্রথম ম্যাচেই শক্ত বার্তা দিয়েছে চট্টগ্রাম রয়্যালস।










Discussion about this post