বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিক্সিং, দুর্নীতি কিংবা ম্যাচ প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগ এলেই যে তদন্ত শুরু হয়ে যায়, বিষয়টি এমন নয়। অভিযোগের ধরন, তথ্যের গুরুত্ব এবং প্রাথমিকভাবে কোড লঙ্ঘনের সম্ভাবনা-সবকিছু বিবেচনা করেই তদন্তে নামে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি ইউনিট।
বিপিএলসহ দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ইন্টিগ্রিটি সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা এই ইউনিটের প্রধান অ্যালেক্স মার্শাল। সাম্প্রতিক সময়ে বিপিএলে ফিক্সিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়ার পর তদন্তের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন তিনি।
মিরপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্শাল জানান, তার নেতৃত্বাধীন ইউনিট স্বাধীনভাবে কাজ করে। ইউনিটে বাংলাদেশি সদস্যরাও রয়েছেন এবং তিনি সরাসরি বিসিবি সভাপতির কাছে রিপোর্ট করেন, ‘আমার কাজ একেবারেই স্বাধীন এবং গোপন। কেউ এসে আমাকে কিছু বলতে পারে না যে, কীভাবে তদন্ত করতে হবে, কাকে নিয়ে তদন্ত করতে হবে,’ বলেন মার্শাল।
তবে তদন্ত শেষে শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের ভূমিকা মূলত সুপারিশ পর্যন্ত। তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তির বিষয়ে জেনারেল কাউন্সিলকে পরামর্শ দেন মার্শাল। এরপর সভাপতি ও জেনারেল কাউন্সিল বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
কোনো ম্যাচে একটি দল খুব খারাপ খেলল, আর সঙ্গে সঙ্গে সমর্থকদের কেউ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ তুললেন-এমন ঘটনায় সাধারণত তদন্ত শুরু করে না ইন্টিগ্রিটি ইউনিট।
মার্শালের ব্যাখ্যায়, প্রথমে অভিযোগ বা রিপোর্টের তথ্য যাচাই করে দেখা হয় সেটি আদৌ তদন্ত করার মতো কি না। তিনি বলেন, কোনো দল ৫০ রানে অলআউট হওয়ার পর ক্ষুব্ধ কোনো সমর্থক ফোন করে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ তুলতেই পারে। কিন্তু এমন অভিযোগকে তদন্তের ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয় না।
তবে অভিযোগের সঙ্গে যদি গুরুত্বপূর্ণ বা ‘ইন্টারেস্টিং’ কোনো তথ্য থাকে, সেটি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। কোড লঙ্ঘনের সম্ভাবনা দেখা গেলেই শুরু হয় আনুষ্ঠানিক তদন্ত।
তদন্তের সূত্র আসতে পারে বিভিন্ন জায়গা থেকে। কোনো ক্রিকেটার যদি জানতে পারেন, তাকে খারাপ খেলার বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটিও তদন্তের সূচনা হতে পারে।
শুধু ক্রিকেটার নয়, ম্যানেজার, কোচ কিংবা সাংবাদিকদের কাছ থেকেও তথ্য আসতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ক্ষেত্রে আইসিসি বিষয়টি দেখভাল করে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে ঘরোয়া ক্রিকেটের কোনো সন্দেহজনক বিষয় আইসিসির নজরে এলে সেটিও বিসিবির কাছে পাঠানো হয়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দায়িত্ব আইসিসির এবং দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের ইন্টিগ্রিটি সংক্রান্ত বিষয় বিসিবির আওতাধীন।
তদন্ত শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ না করার নীতিতে চলে ইন্টিগ্রিটি ইউনিট। মার্শাল জানিয়েছেন, গত নয় বছরে তিনি শতাধিক মামলা সামলালেও তদন্ত চলাকালে কারও নাম প্রকাশ করেননি।
তদন্ত শেষ হওয়ার পর এবং শাস্তির সিদ্ধান্ত হলে তখনই অভিযুক্তের পরিচয় প্রকাশ করা হয়। তদন্ত কতদিন চলবে, সেটিও নির্দিষ্ট নয়। কোনো কোনো মামলা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো তদন্ত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে।
কারণ তদন্তে শুধু ম্যাচের ঘটনাই দেখা হয় না। প্রয়োজনে মোবাইল ফোনের তথ্য, ভয়েস বিশ্লেষণ এবং আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হয়।
তদন্তের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে একাধিকবার বক্তব্য নেওয়া হতে পারে।
মার্শাল জানিয়েছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্তের দুই, তিন এমনকি চারবারও স্টেটমেন্ট নেওয়া হয়। পাশাপাশি মোবাইল ফোনের তথ্যও পরীক্ষা করা হয়।
ইন্টিগ্রিটি কোড অনুযায়ী তদন্তে সহযোগিতা করাও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কেউ মোবাইল ফোন দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা তদন্তে সহযোগিতা না করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এই কোড শুধু ক্রিকেটারদের জন্য নয়। ক্রিকেটার, ম্যানেজার, কোচ, বোর্ডের সদস্য থেকে শুরু করে গ্রাউন্ডস্টাফ—ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত সবাই এর আওতায় থাকেন।
এমনকি কোনো ক্রিকেটার অবসর নেওয়ার পরও তার শেষ ম্যাচের পর দুই বছর পর্যন্ত অ্যান্টি-করাপশন কোড কার্যকর থাকে। কোচসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
প্রতিটি তদন্তের শেষেই যে শাস্তি হবে, এমনটিও নয়। মার্শালের ব্যাখ্যায় তদন্তের ফল মূলত তিন ধরনের হতে পারে। প্রথমত, কোড লঙ্ঘনের শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তির সম্ভাবনা থাকে। দ্বিতীয়ত, কিছু প্রমাণ পাওয়া গেলেও শাস্তি দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্ত ভিত্তি না থাকলে বিষয়টি রিভিউতে রাখা হতে পারে। আর তদন্ত শেষে যদি দেখা যায় অভিযোগের ভিত্তি নেই বা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাহলে মামলা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভুল পরিচয় শনাক্ত হওয়ার ঘটনাও তদন্তের ফল হিসেবে আসতে পারে। সেক্ষেত্রেও অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তদন্ত শেষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তির বিষয়ে পরামর্শ দেন অ্যালেক্স মার্শাল। এরপর বিসিবির জেনারেল কাউন্সিল সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
বিসিবির আইনজীবী ও ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের কাউন্সিল ব্যারিস্টার মাহিন এম রহমানও বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তার ভাষায়, অ্যালেক্স মার্শাল বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেন, কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে সেটি নির্ধারণ করে গভর্নিং কাউন্সিল।
শাস্তি পাওয়ার পর অভিযুক্তের সামনে আপিলের সুযোগও থাকে। সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর ১৪ দিনের মধ্যে শাস্তি মেনে নেওয়া অথবা আপিল করা যায়। আপিল হলে বিষয়টি স্বাধীন ট্রাইব্যুনালে যায় এবং সেখানে আদালতের শুনানির মতো করেই মামলার শুনানি হয়। শেষ পর্যন্ত শাস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয় সেই ট্রাইব্যুনাল।



