বল সীমানার দড়ি ছুঁতেই হেলমেট খুলে ফেললেন তাওহীদ হৃদয়। ব্যাটটা উঁচিয়ে ধরলেন, মুখে তৃপ্তির হাসি। ছয় বছর আগে যে মাঠে সতীর্থদের সঙ্গে বাংলাদেশের যুব বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাসে মেতেছিলেন, সেই সেনওয়েস পার্কেই এবার একক কীর্তির উদযাপন। তবে এবারের আনন্দটা একটু আলাদা-দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে বাংলাদেশের ‘এ’ দলের অধিনায়ক হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন হৃদয়।
ডাবল সেঞ্চুরির মুহূর্তে হৃদয়ের ব্যাটে ছিল ২০৩ রান। ৩৩৯ বলে ২২টি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ইনিংসটি তাকে এনে দিয়েছে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এটিই তার প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি নয়-২০২২ সালের বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিটিই তিনি রূপ দিয়েছিলেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘এ’ দলের বিপক্ষে এবারের ২০০ অবশ্য আলাদা করে মনে থাকবে, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে আবেগের স্মৃতিগুলোর একটি।
২০২০ সালে এই সেনওয়েস পার্কেই ভারতকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছিল বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান তামিম, শরীফুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসান জয়দের সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক দলের অংশ ছিলেন হৃদয়ও। ছয় বছর পর আবারও একই মাঠে তার ফেরা। এবার হাতে জাতীয় দলের রঙ নয়, ‘এ’ দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব; আর ব্যাট হাতে এমন এক ইনিংস, যা ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে সেই বিশ্বজয়ের দিনগুলোতে।
ডাবল সেঞ্চুরি করার পর নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে হৃদয় সেই আবেগই প্রকাশ করেছেন। লিখেছেন, ‘আমার লাল বলের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট শুরু হয়েছিল জন্মস্থান বগুড়া থেকে। আজকে যে মাঠে ২০০ করলাম আল্লাহর রহমতে, এই মাঠেই আমরা বিশ্বজয় করছিলাম ২০২০ সালে। সব কিছুর জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
এই মাঠে ফেরার অনুভূতি যে হৃদয়ের কাছে কতটা বিশেষ, সেটি বোঝা যাচ্ছিল ডাবল সেঞ্চুরির আগেই। গত ২৮ আগস্ট সেনওয়েস পার্কের সামনে সতীর্থদের সঙ্গে ছবি তুলে তিনি লিখেছিলেন, ‘এই সেই মাঠ যেখানে রচিত হয়েছিলো বাংলাদেশের একমাত্র বিশ্বকাপ (২০২০ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ) জয়ের ইতিহাস। আবারও সেই মাঠে আসার অনুভূতি কখনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’ কয়েক দিন পর সেই একই মাঠে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাটের মাধ্যমে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় লিখলেন তিনি।
ডাবল সেঞ্চুরির পথটাও অবশ্য খুব মসৃণ ছিল না। ১৯৮ থেকে ১৯৯ রানে পৌঁছানোর সময় দ্বিতীয় রানটি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন হৃদয়। সেই রান পূর্ণ করতে পারলে তখনই দুইশ ছুঁয়ে ফেলতেন। কিন্তু দ্বিতীয় রানটি নিতে না পারায় অপেক্ষা বাড়ে আরও ১৪ বল। এর মধ্যে বেশির ভাগ সময়ই ছিলেন নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে। অবশেষে ১৩৭তম ওভারে স্ট্রাইক ফিরে পেয়ে প্রথম বলেই কাট শট খেলেন। বল বাউন্ডারি পেরোতেই ২০৩ রানে পৌঁছে যান হৃদয়। এরপরই হেলমেট খুলে ব্যাট উঁচিয়ে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস।
এই ডাবল সেঞ্চুরি এসেছে দলের কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল প্রথম ইনিংসে তুলেছিল ৫১২ রান। জবাবে বাংলাদেশ ‘এ’ দল ১৩৫ রানেই হারিয়ে ফেলেছিল প্রথম চার উইকেট। সেখান থেকে জাকের আলীকে সঙ্গে নিয়ে ইনিংস মেরামতের কাজ শুরু করেন হৃদয়। পঞ্চম উইকেটে দুজন যোগ করেন ১৫১ রান। জাকের ৯৪ রানে বোল্ড হয়ে ফিরে গেলে সেঞ্চুরির আক্ষেপটা থেকে যায় তার। হৃদয় অবশ্য থামেননি।
জাকেরের বিদায়ের পর সাইফউদ্দিনকে নিয়ে এগিয়ে যান অধিনায়ক। হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির সময়ও ক্রিজের অন্য প্রান্তে ছিলেন সাইফউদ্দিন। তবে তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার ঠিক আগে ৮৭ রানে আউট হয়ে যান তিনি। ফলে দিনের শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ৪৭১ রান। দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের চেয়ে এখনও ৪১ রানে পিছিয়ে সফরকারীরা।



