দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ব্যাটিং করা সহজ নয়। পেসারদের গতি, বাউন্স আর কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জে এই মাঠগুলো বরাবরই ব্যাটসম্যানদের কঠিন পরীক্ষা নেয়। সেই পেসারদের স্বর্গরাজ্যেই এবার এমন এক কীর্তি গড়লেন তাওহীদ হৃদয়, যা শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটেই নয়, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসেও আলাদা করে লেখা থাকবে।
অপরাজিত ৩৫০ রান।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এমন ইনিংস এখন আর নিয়মিত দেখা যায় না। অথচ দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে হৃদয় শুধু সেই বিরল মাইলফলক স্পর্শই করেননি, ইনিংসটিকে নিয়ে গেছেন আরও অনেক দূর। তার ব্যাটে লেখা হয়েছে এমন এক মহাকাব্য, যেখানে একসঙ্গে ভেঙেছে একাধিক রেকর্ড।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩৫০ রান করা ব্যাটসম্যানের তালিকাটিও কম কিংবদন্তিপূর্ণ নয়। স্যার ভিভ রিচার্ডস, গ্রায়েম হিক, ডব্লিউজি গ্রেস, ব্রায়ান লারার মতো ক্রিকেটের মহাতারকারা যে এলিট ক্লাবে আছেন, সেখানে এবার যুক্ত হলো তাওহীদ হৃদয়ের নাম।
তবে হৃদয়ের ইনিংসটি হয়তো আরও বড় হতে পারত। ৩৫০ রানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অধিনায়ক ইনিংস ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেন। সৌজন্য দেখিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলকে ব্যাটিংয়ে পাঠানো হয়। বাংলাদেশের হাতে তখনো ছিল দুই উইকেট। অর্থাৎ অধিনায়ক ঘোষণা না করলে হৃদয়ের ব্যাট আরও কতদূর যেত, সেই প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে গেল।
দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসে তুলেছিল ৫১২ রান। জবাবে বাংলাদেশ ‘এ’ দল ৮ উইকেটে ৬৭৬ রান করে ইনিংস ঘোষণা করেছে। লিড দাঁড়িয়েছে ১৬৪ রানের। এই রান তুলতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বল করতে হয়েছে ১৯১.২ ওভার, অর্থাৎ ১ হাজার ১৪৮ বল। এত দীর্ঘ সময় বল করেও বাংলাদেশের ইনিংসের পতন ঘটাতে পারেনি স্বাগতিকেরা।
এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয় হৃদয়ের ৩৫০ কতটা বড়।
তবে এই ইনিংসের মাহাত্ম্য শুধু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের পরিসরে আটকে নেই। ম্যাচটি দুই দেশের ‘এ’ দলের হলেও দুই স্কোয়াডেই রয়েছেন জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। ফলে এটি নিছক ঘরোয়া ক্রিকেটের কোনো ম্যাচ নয়। বরং জাতীয় দলের দরজায় থাকা ক্রিকেটারদের নিজেদের প্রমাণের অন্যতম মঞ্চ। আর সেই মঞ্চেই হৃদয় নিজের নামটি এমনভাবে লিখলেন, যা মুছে ফেলা সহজ হবে না।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিদেশি কোনো ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডও এখন হৃদয়ের দখলে। এত দিন এই রেকর্ড ছিল ইংল্যান্ডের ডেনিস কম্পটনের। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে তার করা ৩০০ রানই ছিল কোনো বিদেশি ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ইনিংস। হৃদয়ের ৩৫০ সেই রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে ৫০ রানে।
বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তো হৃদয় ইতিহাসই গড়েছেন। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের তালিকায় এই ইনিংস তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে এটি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।
সামনে শুধু একজন-স্টিফেন কুক। তার ৩৯০ রান এখনো শীর্ষে। মজার ব্যাপার হলো, হৃদয়ের ৩৫০ এমন এক ইনিংস, যা দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অধিকাংশ প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানও ছুঁতে পারেননি। স্টিফেন কুক ছাড়া কোনো দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যানও সেখানে ৩৫০ বা তার বেশি রান করতে পারেননি। যে দেশে ব্যাটিংয়ের এমন সুযোগ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানরা খেলেন, সেই দেশেই একজন বাংলাদেশি এসে তাঁদের অনেকের নাগালের বাইরে থাকা একটি উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন।
হৃদয়ের এই ইনিংস তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি বার্তাও।
কারণ বছরের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে জাতীয় দলের টেস্ট সিরিজ রয়েছে। সেই সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সামনে অপেক্ষা করবে একই ধরনের কঠিন কন্ডিশন, একই বাউন্স, একই গতির পেস আক্রমণ। সেখানে ব্যাটিং নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই থাকবে সংশয়। কিন্তু হৃদয়ের ৩৫০ সেই সংশয়ের মধ্যে নতুন একটি সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে।
জাতীয় দলের টেস্টে কী হবে, সেটি অবশ্য এখনই বলা যায় না। ‘এ’ দলের ম্যাচ আর আন্তর্জাতিক টেস্ট এক নয়। প্রতিপক্ষ, চাপ, কৌশল-সবই আলাদা। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দীর্ঘ সময় ব্যাট করে রান করার সামর্থ্য যে বাংলাদেশের একজন তরুণ ব্যাটসম্যানের আছে, হৃদয় সেটি চোখের সামনে দেখিয়ে দিয়েছেন।
যুব বিশ্বকাপজয়ী সেই হৃদয় এবার দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতেই গড়লেন নতুন এক ইতিহাস। ৩৫০ রানে অপরাজিত থেকে শুধু রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম লেখালেন না, বছরের শেষে জাতীয় দলের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগেও যেন দিয়ে রাখলেন একটি সাহসী বার্তা-প্রোটিয়াদের মাটিতে বড় ইনিংস খেলা অসম্ভব নয়।
হৃদয় সেটি শুধু বলেননি, ব্যাট দিয়ে প্রমাণ করেছেন।



