বাংলাদেশ ক্রিকেটে এমন ঘটনা আগে খুব কমই দেখা গেছে। জাতীয় দলের একজন নিয়মিত ক্রিকেটার, যিনি দেশের হয়ে টেস্ট ক্রিকেট খেলেন, তিনি নিজ শহরে পুলিশের হাতে হয়রানির শিকার হয়েছেন-খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও তৈরি হয়েছিল ব্যাপক আলোড়ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ক্রিকেট মহল, সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন নাঈম হাসান।
ঘটনার পর কয়েকদিন কেটে গেছে। নানা আলোচনা, সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এতদিন নীরব ছিলেন বাংলাদেশের এই অফস্পিনার। অবশেষে মুখ খুললেন তিনি। তবে ক্ষোভ নয়, নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় কৃতজ্ঞতার কথাই বেশি উচ্চারণ করেছেন নাঈম।
ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘প্রথমেই আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি এখন নিরাপদে আছি এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি। ঘটনার পরপরই যারা এগিয়ে এসে আমাকে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
ঘটনার পর ক্রিকেটাঙ্গনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া আসে। নাঈমের পাশে দাঁড়ান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবাল। বোর্ডের অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেন। ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবও প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিনিধিদল পাঠায় তার সঙ্গে দেখা করতে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অসংখ্য ক্রিকেটপ্রেমী। সেই সমর্থন ও ভালোবাসার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
নাঈম লিখেছেন, ‘সংকটময় সেই মুহূর্তে যারা দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের সবাইকে হৃদয়ের গভীর থেকে ধন্যবাদ। আপনাদের সবার নাম হয়তো আমি জানি না, কিন্তু আপনাদের মানবিকতা ও সহমর্মিতা আমি কখনই ভুলব না। আমার ভক্ত, বন্ধু, সতীর্থ, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং যারা ফোন, বার্তা, সাক্ষাৎ ও দোয়ার মাধ্যমে আমার খোঁজ নিয়েছেন, সবার ভালোবাসা ও উদ্বেগে আমি সত্যিই অভিভূত। এই কঠিন সময়ে আপনাদের সমর্থন আমাকে অনেক শক্তি জুগিয়েছে।’
কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও নাঈমের বক্তব্যে প্রতিশোধ কিংবা অভিযোগের সুর নেই। বরং আছে মানুষের প্রতি আস্থা ফিরে পাওয়ার অনুভূতি। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর তিনি যেমন আতঙ্ক ও মানসিক চাপে পড়েছিলেন, তেমনি একই সঙ্গে দেখেছেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা ও সংহতি। সেই কারণেই হয়তো তাঁর বার্তাজুড়ে বারবার উঠে এসেছে কৃতজ্ঞতার কথা।
এদিকে ঘটনার পর অনেকেই ফোন ও বার্তার মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। তবে পরিস্থিতির কারণে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এই স্পিনার।
নাঈম লিখেছেন, ‘সব ফোনকলের উত্তর দিতে না পারা বা প্রতিটি বার্তার জবাব দিতে না পারার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। দয়া করে আমাকে এবং আমার পরিবারকে আপনাদের দোয়ায় রাখবেন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন, সুস্বাস্থ্য দান করুন এবং যারা আমাকে সাহায্য করেছেন ও আমার জন্য দোয়া করেছেন, তাদের সবাইকে তার অফুরন্ত রহমত ও বরকতে সিক্ত করুন। অন্তরের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা।’
সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন নাঈম। মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে আবারও ক্রিকেটে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। চলতি মাসের শেষ দিকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারে টেস্টে মাঠে নামার কথা রয়েছে তাঁর। তার আগে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের হয়ে চার দিনের ম্যাচ খেলবেন।
ক্রিকেটারদের জীবন সাধারণত পরিমাপ করা হয় উইকেট, রান কিংবা রেকর্ড দিয়ে। কিন্তু গত কয়েক দিনে নাঈম হাসান বুঝেছেন, একজন ক্রীড়াবিদের আসল শক্তি কখনো কখনো মাঠের বাইরেও তৈরি হয়। দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমর্থকদের উদ্বেগ আর সহমর্মিতাই হয়তো তাকে আবারও দিয়েছে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর সাহস!









Discussion about this post