মিরপুরে যেন জন্ম নিল নতুন এক বাংলাদেশ। যে দল একসময় টেস্ট ক্রিকেটে লড়াই করেই সন্তুষ্ট থাকত, সেই দলই এবার পাকিস্তানকে হারাল দাপট দেখিয়ে। নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে সিরিজের প্রথম টেস্টে পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়ে দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ।
আজ ম্যাচের শেষ দিনে যে নাটকীয়তা দেখা গেল, তা যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে দিল পুরো গল্প। বৃষ্টির কারণে আগের দুই দিন খেলার অনেক সময় নষ্ট হওয়ায় ম্যাচ ড্রয়ের দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ৪১৩ রানের জবাবে পাকিস্তানও ৩৮৬ রান তুলে শক্ত অবস্থানে ছিল। কিন্তু পঞ্চম দিনের সকালে আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক শান্ত। দ্রুত রান তুলে ২৪০ রানে ইনিংস ঘোষণা করে পাকিস্তানের সামনে ২৬৭ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দেন তিনি।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল নিজের বোলারদের ওপর পূর্ণ আস্থা। ম্যাচ শেষে শান্ত বলেন, ‘আমরা এজন্যই ইনিংস ঘোষণা করেছি কারণ আমাদের কোয়ালিটি বোলার আছে। নাহিদ, তাসকিন, এবাদত, মিরাজ ও তাইজুল দারুণ বোলিং করেছে।’
চতুর্থ ইনিংসে মিরপুরের উইকেটে রান তাড়া করা সবসময়ই কঠিন। সেই কঠিনতাকে আরও ভয়ংকর করে তুললেন নাহিদ রানা। পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের শরীরী ভাষাতেই ধরা পড়ছিল অস্বস্তি। বিশেষ করে বিরতির পর রানার আগুনঝরা স্পেলে পুরো ম্যাচ ঘুরে যায় বাংলাদেশের দিকে।
সৌদ শাকিলের ভুল শট, রিজওয়ানের বিভ্রান্তি- সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন এই তরুণ পেসার। একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৫ উইকেট শিকার করে পাকিস্তানকে ১৬৩ রানে থামিয়ে দেন রানা। মিরপুরের গ্যালারি তখন উল্লাসে ফেটে পড়েছে।
রানার বোলিং নিয়ে ম্যাচ শেষে মজার ছলে শান্ত বলেন, ‘ওরাও জানে রানাকে বাউন্সার মারলে আবার খেতে হবে। আমি হলে মারতাম না। আমার শখ নেই এতো জোড়ে বল খেলার। তবে এখন আমরা জবাব দিতে পারি। আস্তে আস্তে আমরা টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতি করছি। দিন শেষে আমরা এটাই করতে চাই। ছেলেরা যেভাবে খেলেছে তাতে আমি গর্বিত। বিশেষ করে এই টেস্টে যেভাবে খেলেছে।’
এই জয়কে শুধুই একটি ম্যাচ জয় হিসেবে দেখছেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার চোখে এটি দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল। শান্ত বলেন, ‘এই ম্যাচ জিততে পেরে খুবই খুশি। গত দুই মাসে অনেক পরিশ্রম করেছি আমরা। এবারই প্রথম বাংলাদেশের পাকিস্তানকে হারিয়েছি এটা জানতাম না। আমরা ধীরে ধীরে টেস্টে ভালো দল হয়ে উঠছি।’
ব্যাট হাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন শান্ত। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেছেন ৮৭ রান। জোড়া সেঞ্চুরি না পেলেও ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন তিনিই। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অধিনায়ক বলেন, ‘খুব খুশি। ছেলেরা যেভাবে খেলেছে, তাতে গর্বিত। গত কয়েক মাস আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমরা ধীরে ধীরে টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতি করছি, এটাই সব সময় চেয়েছিলাম।’
শুধু নিজের পারফরম্যান্স নয়, সতীর্থদের অবদানও তুলে ধরেন শান্ত। তিনি বলেন, ‘মুমিনুল ভাই দুর্দান্ত খেলেছেন। বাউন্স বেশি ছিল, কিন্তু আমরা ভালো শট মেরেছি। মুশফিকুর ভাইও দারুণ ছিলেন।’
অন্যদিকে পাকিস্তান অধিনায়ক শান মাসুদ স্বীকার করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারাই তাদের হার ডেকে এনেছে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পিচে টেস্ট ক্রিকেট শেখায়, প্রতিপক্ষকে যখন চাপে রাখার সুযোগ পাও, তখন সেটা কাজে লাগাতে হয়। সেটা করতে পারিনি।’










Discussion about this post