আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি এখন আর কেবল একটি অংশগ্রহণ না করার খবর নয়, এটি দেশের ক্রিকেট ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ সতর্ক সংকেত। আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা দেওয়া হয়েছে স্কটল্যান্ডকে। বিসিবির টানা তিন সপ্তাহের দেনদরবার, ব্যাখ্যা আর আলোচনার পরও শেষ রক্ষা হয়নি। ২১ জানুয়ারি আইসিসির বোর্ড সভায় ২–১৪ ভোটে বাংলাদেশের বিপক্ষে রায় আসে। এই সংখ্যাই বলে দেয়, বিশ্ব ক্রিকেট রাজনীতিতে বাংলাদেশ কতটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে আগে এসে পড়ছে অর্থনীতিতে। বিশ্বকাপে অংশ নিলেই প্রতিটি দলকে আইসিসি যে পার্টিসিপেশন ফি দেয়, সেটিই বাংলাদেশ এবার পাচ্ছে না। তিন লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা—এই অর্থ না পাওয়া বিসিবির জন্য সরাসরি ক্ষতি। তবে এটি কেবল দৃশ্যমান ক্ষতির শুরু মাত্র। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত ছিল আইসিসির রাজস্ব বণ্টনের বড় একটি অংশ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে পারলে আইসিসির মোট আয়ের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশ পেত প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকার সমান। অংশ না নেওয়ায় সেই রাজস্বের দরজাই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্বকাপ মানেই শুধু অংশগ্রহণ ফি নয়, প্রতিটি ধাপে ধাপে ছিল প্রাইজমানির সুযোগ। গ্রুপ পর্ব পার হওয়া, নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকা কিংবা ম্যাচ জয়ের জন্য আলাদা আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখে আইসিসি। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ স্থানে থাকা দলগুলোর জন্য সাড়ে চার লাখ ডলারের প্রাইজমানি ছিল নিশ্চিত। প্রতিটি ম্যাচ জিতলেই যোগ হতো আরও প্রায় ৩১ হাজার ডলার। বাংলাদেশ ন্যূনতম কিছু ম্যাচ জিতলেও কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ যোগ হতো বোর্ডের তহবিলে। এবার সেই সম্ভাবনাগুলো পুরোপুরি বিলীন।
উল্টো দিকে ঝুলে আছে জরিমানার খড়্গ। আইসিসিকে সন্তোষজনক কারণ দেখাতে না পারলে বিসিবিকে গুনতে হতে পারে প্রায় ২০ লাখ ডলার জরিমানা। অর্থাৎ বিশ্বকাপ থেকে যেখানে কোনো আয় আসছে না, সেখানে আবার পকেট থেকেই বেরিয়ে যেতে পারে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে বোর্ডের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির পরিধি আরও ভয়ংকর। বিসিবির মোট আয়ের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই আসে আইসিসি থেকে। ২০২৪ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত রাজস্ব বণ্টন চক্রে প্রতিবছর যে প্রায় ৩৩৭ কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটি কমে যাওয়ার বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৮ পরবর্তী চক্রে বাংলাদেশের বর্তমান ৪.৪৬ শতাংশ ভাগ কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। এর পাশাপাশি আইসিসির বিভিন্ন কমিটিতে বাংলাদেশের উপস্থিতি, প্রভাব এবং ভোটাধিকারও হ্রাস পেতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করবে।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের সম্প্রচার ও বিজ্ঞাপন বাজারও। বাংলাদেশে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল সম্প্রচারক চ্যানেল এবং বিজ্ঞাপনদাতারা বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়ছে। বাংলাদেশের ম্যাচ মানেই যে বিপুল দর্শকসংখ্যা, সেই আকর্ষণ হারিয়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচার অনেকটাই মূল্যহীন হয়ে পড়ছে স্থানীয় বাজারে। স্পন্সররা আগ্রহ হারাচ্ছে, বিজ্ঞাপনী ক্যাম্পেইন থমকে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে গণমাধ্যম শিল্পে।
এই ক্ষতির বড় ভুক্তভোগী ক্রিকেটাররাও। বিশ্বকাপ খেললে ম্যাচ ফি, ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা মিলিয়ে প্রতিটি ক্রিকেটারের জন্য নিশ্চিত আর্থিক আয় থাকত। কয়েকটি ম্যাচ খেললেই একজন ক্রিকেটার পেতেন লক্ষাধিক টাকা। সঙ্গে থাকত ম্যাচসেরা পুরস্কার, পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বাড়তি আয়ের সুযোগ। বিশ্বকাপ না থাকায় সেই সব দরজাই বন্ধ। উপরন্তু, বিশ্বকাপের সময় যে বাড়তি স্পন্সর ও বিজ্ঞাপন চুক্তির সুযোগ তৈরি হয়, সেটিও এবার হারাচ্ছেন ক্রিকেটাররা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো ক্রিকেট কূটনীতি। আইসিসির বোর্ড সভার ভোটাভুটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা দুর্বল। এই দুর্বলতা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেপ্টেম্বরে ভারতের বাংলাদেশ সফর নিয়েই ইতোমধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভারত না এলে সেটি হবে শুধু একটি সিরিজ বাতিল নয়, বরং বিপুল রাজস্ব হারানোর ঘটনা। ভারতের দেখাদেখি ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দলগুলোর সফর নিয়েও শঙ্কা তৈরি হতে পারে, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সূচিকে আরও সংকুচিত করবে।










Discussion about this post