বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে এক নতুন ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে উঠছেন আকবর আলী। ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের সেই শান্ত স্বভাবের অধিনায়ক এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে রংপুর বিভাগের সাফল্যের মূল কারিগর। সদ্যসমাপ্ত এনসিএল টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে রংপুর বিভাগকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জিতিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি।
তবে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা জাতীয় দলের দরজা খুলে দেয়নি এখনো। তার এক সময়ের সতীর্থরা-শরিফুল ইসলাম, তাওহীদ হৃদয়, তানজিদ হাসান তামিম, মাহমুদুল হাসান জয়, শামীম পাটোয়ারী-সবাই এখন জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ। একমাত্র আকবরই রয়ে গেছেন বাইরে।
কিন্তু এ নিয়ে কোনো হতাশা নেই তার। বরং আকবরের কণ্ঠে ভেসে আসে প্রশান্ত এক আত্মবিশ্বাস, ‘একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে ওরা খেলছে আমি নাই-এই চিন্তা আমার মধ্যে কাজ করে না। খারাপ লাগে তখনই, যখন আমি নিজে খারাপ খেলি। যেখানে খেলি, চেষ্টা করি ভালো করার।’
জাতীয় দলের স্বপ্ন অবশ্য এখনো জেগে আছে তার মধ্যে, ‘অবশ্যই, সবারই একটা স্বপ্ন থাকে জাতীয় দলে খেলার, আমারও আছে।’ কিন্তু সেই স্বপ্নকে তিনি অপেক্ষা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে চান।
ফাইনালে রংপুরের জয়ের পেছনে আকবরের কৌশল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কুয়াশার প্রভাব মাথায় রেখে আগেভাগে স্পিনারদের ব্যবহার করেন তিনি। আকবর ব্যাখ্যা করেন, ‘আমরা জানতাম ৩৫–৪০ মিনিট পর কুয়াশা নামবে। তখন স্পিনারদের বল গ্রিপ করা কঠিন হয়ে যাবে। তাই পরিকল্পনা ছিল ওদের দ্রুত ব্যবহার করা, যা দারুণভাবে কাজে দিয়েছে।’
নেতৃত্বে যেমন বিচক্ষণ, তেমনি ব্যাট হাতে ছিলেন কার্যকর। পুরো টুর্নামেন্টে ৯ ইনিংসে ২২২ রান করেন ৩১.৭১ গড়ে ও ১৪৭.০২ স্ট্রাইক রেটে। চট্টগ্রামের মাহমুদুল হাসান জয় ছাড়া কারও রান তাঁর চেয়ে বেশি ছিল না। এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সেই তিনি জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার।
তবে আকবর চান না তাকে শুধু অধিনায়ক হিসেবেই দেখা হোক, ‘অধিনায়কত্ব বাড়তি দায়িত্ব, এটা সবসময় থাকবে না। কিন্তু ব্যাটার, কিপার-এটাই আমার মূল পরিচয়। আমি প্রথমে খেলোয়াড়, তারপর নেতা।’
রংপুরের টানা দুটি টি-টোয়েন্টি শিরোপা, চারদিনের এনসিএলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, বিসিএলে উত্তরাঞ্চলকে সাফল্যের শিখরে তোলা-সব জায়গাতেই তার ছোঁয়া স্পষ্ট। তবুও নিজের প্রতি প্রত্যাশা থামাননি তিনি।
সিলেটের মাঠে দর্শক কম থাকলেও আকবর বিশ্বাস করেন, দেশের অন্য মাঠে আরও বেশি সাড়া পাওয়া যেত। তিনি বলেন, ‘রাজশাহী বা বগুড়ায় খেলা হলে হাজার হাজার দর্শক মাঠে আসত। আমি নিজে বগুড়ায় টিকিটের লম্বা লাইন দেখেছি।’
সবশেষে আকবরের কণ্ঠে শোনা যায় পেশাদার ক্রিকেটারের বাস্তবতা ও সংযমের প্রতিচ্ছবি, ‘আমি এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবি না। মাঠে সুযোগ পাই যেখানে, চেষ্টা করি ভালো খেলার। বাকিটা সময়ই ঠিক করে দেবে।’
ঘরোয়া ক্রিকেটে তার নেতৃত্ব ও ব্যাটিং ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ দিচ্ছে যে, জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ার সময় হয়তো আর বেশি দূরে নয়। এখন শুধু প্রয়োজন, সেই দরজাটা একবার খুলে যাওয়া-যেখানে দাঁড়িয়ে আকবর আলী হয়তো প্রমাণ করবেন, তার গল্প এখনো অসম্পূর্ণ নয়!










Discussion about this post