ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই উপমহাদেশে উত্তেজনার পারদ আকাশচুম্বী। চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লড়াই ঘিরে শুরুর দিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কালো মেঘ দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত সব জট কাটিয়ে মাঠে গড়াতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি। কয়েক দফা আলোচনা শেষে সংকটের সমাধান হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে আয়োজক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো, আর সমর্থকেরা অপেক্ষায় আছেন আরেকটি হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের।
রবিবার কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম-এ অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচটি। ৩৫ হাজার দর্শকধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামের সব টিকিট আগেভাগেই বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে এএফপি। টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক সমর্থককে কালোবাজার থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি দামে টিকিট সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচ ঘিরে উন্মাদনা যে তুঙ্গে, টিকিট পরিস্থিতিই তার বড় প্রমাণ।
শুধু টিকিট নয়, কলম্বোমুখী ফ্লাইট ও হোটেল ভাড়াতেও পড়েছে ব্যাপক প্রভাব। রয়টার্স জানিয়েছে, ম্যাচ উপলক্ষে কলম্বোর হোটেল রুমের ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। যে কক্ষের জন্য আগে ১০০ থেকে ১৫০ ডলার ব্যয় হতো, সেটির জন্য এখন গুনতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬৬০ ডলার। বিভিন্ন বুকিং সাইটেও এমন চিত্র দেখা গেছে। কলম্বোর তিনটি ট্রাভেল এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার পর শেষ মুহূর্তে চেন্নাই ও দিল্লির মতো শহর থেকে ফ্লাইট বুকিং হঠাৎ বেড়ে যায়।
চেন্নাই থেকে কলম্বো যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা, অথচ অল্প দূরত্বের এই রুটের ভাড়াও বেড়েছে কয়েক গুণ। বর্তমানে চেন্নাই-কলম্বো রুটে ভাড়া ৬২৩ থেকে ৭৫৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। দিল্লি থেকে কলম্বোর ফ্লাইট ভাড়াও প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬৬ ডলারে। শ্রীলঙ্কা ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটরসের সভাপতি নালিন জয়াসুন্দেরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ হোটেলই প্রায় পূর্ণ, আর অনেক সমর্থক ১৫০০ থেকে ২০০০ ডলারের ‘অল-ইনক্লুসিভ’ প্যাকেজে সফরে আসছেন।
চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারি। অষ্টম দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচ ঘিরে আগ্রহের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এক যুগের বেশি সময় ধরে কেবল আইসিসি ও এসিসির টুর্নামেন্টেই মুখোমুখি হয় ভারত ও পাকিস্তান। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে ভারতের প্রাধান্য স্পষ্ট; টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আট দেখায় সাতটিতেই জিতেছে ভারত। তবু প্রতিবারের মতো এবারও উত্তেজনায় কোনো ঘাটতি নেই।
এই ম্যাচের আর্থিক গুরুত্বও কম নয়। আইসিসির অন্যান্য ম্যাচের তুলনায় ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ থেকে দ্বিগুণ বা তারও বেশি আয় করে থাকে। পাকিস্তান শুরুতে আপত্তি জানানোয় আয়োজকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজার বৈঠকে সমাধান আসে। বাংলাদেশকে নিয়ে উত্থাপিত দাবি মেনে নেওয়ার পর পাকিস্তান সরকার ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ফলে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা কেটে যায়।
শ্রীলঙ্কার জন্যও ম্যাচটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তৃতীয় বৃহৎ খাত পর্যটন। সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এমন বড় আয়োজন অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শ্রীলঙ্কা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বুদ্ধিকা হেওয়াসাম জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের প্রথম ১০ দিনে প্রায় এক লাখ দর্শনার্থীর ২০ শতাংশই ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে কেন্দ্র করে দেশটিতে এসেছেন। এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কার সক্ষমতার বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে।
লাহোরের বাসিন্দা মিয়া সুলতানের মতো অসংখ্য সমর্থক ইতোমধ্যে কলম্বোর পথে। গ্যালারির সামনের দিকে বসে খেলা দেখতে তার বন্ধুর খরচ হয়েছে প্রায় ৮০০ ডলার। সবার প্রত্যাশা, রাজনৈতিক নাটকীয়তা পেছনে ফেলে মাঠে জমবে ক্রিকেটীয় লড়াই। আর সেই লড়াই ঘিরেই এখন উত্তাল পুরো উপমহাদেশ।










Discussion about this post