প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও বাংলাদেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, সরকার তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে তিনি দেশে ফিরবেন এবং তার বিরুদ্ধে থাকা হত্যা মামলাসহ সব অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অধ্যায় শেষ করার আগে দেশের মাটিতে একটি বিদায়ী সিরিজ খেলা এবং ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সাকিব বলেন, “সরকার যদি আমাকে জানায় যে আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, তাহলে আমি আনন্দের সঙ্গেই দেশে ফিরব, আদালতের বিচারসহ যা যা প্রয়োজন, সবকিছুরই মুখোমুখি হব।” তার দাবি, “আমি জানি, আমি কোনো অন্যায় করিনি।”
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আর দেশে ফেরেননি। বর্তমানে তিনি শ্রীলঙ্কায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলছেন। তবে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চান বলে জানিয়েছেন। আর তা সম্ভব না হলে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন বলেও উল্লেখ করেন।
এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, “ক্যাপ্টেন যা বলেন, আমরা সেটাই অনুসরণ করি। আমার মনে হয়, তারাই ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন, আর আমরা তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করব।”
দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর বাংলাদেশে তার ফাঁকা বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। তবে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানান সাকিব। তার ভাষ্য, সেখানে তিনি শুধু “শান্তি এবং বাংলাদেশের উন্নতির কথা” বলেছেন।
সাকিব জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনজীবীর মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের কাছে তার ভাষায় ‘বানোয়াট’ মামলাগুলো প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কোনো জবাব পাননি। তিনি আরও বলেন, দেশে ফেরার বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলারও ইচ্ছা রয়েছে তার। যদিও এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
অবসরের প্রসঙ্গেও নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার। তিনি বলেন, “আমি বেশির ভাগ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলছি। ভালো লাগছে, খেলাটা উপভোগ করছি, ভালো খেলছিও। কিন্তু বয়স এখন আর আমার পক্ষে নেই। তাই খুব বেশি অপেক্ষা করতে পারব না।”
দেশে ফেরার আগের একটি ব্যর্থ চেষ্টার কথাও তুলে ধরেন সাকিব। তিনি জানান, নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে বিমানে উঠেছিলেন। বিমানবন্দরের লাউঞ্জ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাত্রার বিষয়টি নিশ্চিতও করেছিলেন। কিন্তু পরে তাকে ফিরে যেতে বলা হয়। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে তার মন্তব্য, “১২ ঘণ্টার মধ্যে কী বদলে গেল, আমি জানি না।”
পরে আরেকবার দেশে ফেরার পরিকল্পনাও ভেস্তে যায় শেখ হাসিনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টের কারণে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারি না, বাংলাদেশে আমাকে ঢুকতে না দেওয়ার মানদণ্ড কীভাবে এটা হতে পারে।”
আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে দেশে ফেরা সহজ হতে পারে—এমন পরামর্শও পেয়েছিলেন বলে জানান সাকিব। তবে তার অবস্থান স্পষ্ট। “এটা বিবেচনা করার প্রশ্নই আসে না।”
বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে বলে জানান সাবেক এই সংসদ সদস্য। একটি হত্যা এবং অন্যটি দুর্নীতির অভিযোগে। হত্যা মামলার বিষয়ে তার দাবি, যেদিন মামলাটি করা হয়, সেদিন তিনি কানাডার টরন্টোতে একটি ম্যাচ খেলছিলেন। তাই তার ভাষায়, “এটা হাস্যকর একটা মামলা।”
তদন্তের কারণে গত প্রায় দেড় বছর ধরে তার ব্যাংক হিসাব জব্দ রয়েছে বলেও জানান সাকিব। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি গত ১০ বছর দেশের সবচেয়ে বেশি কর দেওয়া খেলোয়াড়দের একজন, যে সব কর পরিশোধ করেছে, তার অ্যাকাউন্ট যদি দেড় বছর ধরে তদন্তের নামে জব্দ রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব তথ্য আমি দেব। কিন্তু তদন্ত করে কিছু না পেলে তো ছেড়ে দেওয়া উচিত।”
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টের কথাও তুলে ধরেন এই অলরাউন্ডার। গত দুই বছরে বাংলাদেশে থাকা বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের সবার জন্য সময়টা কঠিন ছিল, কিন্তু আমরা টিকে আছি।”










Discussion about this post