২০২০ সালে বাংলাদেশকে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দেওয়া দলের অধিনায়ক ছিলেন আকবর আলী। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স দিয়ে আলোচনায় আসা এই উইকেটকিপার-ব্যাটার জাতীয় দলেও একাধিকবার ডাক পেয়েছেন। তবে এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়নি তার। বাংলাদেশের একাধিক দল একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খেললেও সাম্প্রতিক সময়ে কোনো দলেই জায়গা হয়নি আকবরের। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় দলের পরিকল্পনায় কি তবে পিছিয়ে পড়েছেন তিনি?
আকবরকে ঘিরে তৈরি হওয়া সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন। তার দাবি, জাতীয় দলের হিসাব থেকে মোটেও বাদ পড়েননি আকবর। বরং সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এই ক্রিকেটারের সামর্থ্য নিয়ে নির্বাচকদের কোনো সংশয় নেই।
গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বাশার বলেন, আকবরকে কখনোই হিসাবের বাইরে রাখা হয়নি। জিম্বাবুয়ে সিরিজেও তিনি দলের সঙ্গে ছিলেন এবং সেখানে পারফর্মও করেছেন। ইংল্যান্ডে তার খেলার বিষয়টিও নির্বাচকদের নজরে রয়েছে। তবে নতুনদের সুযোগ দিয়ে তাদের সামর্থ্য যাচাই করার অংশ হিসেবেই আপাতত আকবরের জায়গায় অন্যদের দেখা হচ্ছে।
বাশারের ভাষায়, আকবরের সামর্থ্য সম্পর্কে তারা জানেন এবং তাকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই। অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি সফর হওয়ায় সব ক্রিকেটারকে একসঙ্গে সুযোগ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। তাই আপাতত অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে আকবর আবার জাতীয় দলের পরিকল্পনায় ফিরবেন বলেই জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচক।
অন্যদিকে দীর্ঘ বিরতির পর টি-টোয়েন্টি দলে ফিরেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। এশিয়ান গেমসের স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেওয়া এই ব্যাটার। বিশ্বকাপের পর ফর্ম হারিয়ে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়েছিলেন শান্ত। তার ব্যাটিংয়ের স্ট্রাইকরেট নিয়েও ছিল সমালোচনা। তবে সর্বশেষ বিপিএলে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের অধিনায়ক হিসেবে দারুণ পারফরম্যান্স করে দলকে শিরোপা জেতান তিনি।
শান্তকে ফেরানোর পেছনে টপ অর্ডারে স্থিতিশীলতা আনার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন বাশার। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ ভালো করলেও টপ অর্ডারে কিছুটা অস্থিতিশীলতা রয়েছে। বর্তমান দলে বেশ কয়েকজন আক্রমণাত্মক বা ফ্রি-ফ্লোয়িং ব্যাটার থাকায় এমন একজন ক্রিকেটারের প্রয়োজন ছিল, যিনি ইনিংসকে স্থিরভাবে এগিয়ে নিতে পারবেন। সেই জায়গায় শান্তকে উপযুক্ত মনে করছেন নির্বাচকরা।
বাশার মনে করেন, শান্ত নিয়মিত পারফর্ম করা একজন ক্রিকেটার এবং তিনি ব্যাটিংয়ের বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারেন। ২০২৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে এখন থেকেই খেলোয়াড়দের যাচাই করার সময় বলেও মনে করছেন তিনি। বিশ্বকাপের ছয় মাস আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে তার আগেই সম্ভাব্য ক্রিকেটারদের দেখে নেওয়ার পরিকল্পনা নির্বাচকদের।
এদিকে টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি সিরিজে ব্যাট হাতে নজর কেড়েও এশিয়ান গেমসের দলে জায়গা হয়নি সাব্বির রহমানের। তাকে নিয়ে নির্বাচকদের চিন্তা থাকলেও জিম্বাবুয়ে সিরিজে ইয়াসির আলীর ভালো পারফরম্যান্সের কারণে আপাতত সাব্বিরের সুযোগ হয়নি বলে জানিয়েছেন বাশার। দীর্ঘদিন পর ক্রিকেটে ফেরার পর সাব্বিরকে সামনে আরও পর্যবেক্ষণে রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এইচপি দলের হয়ে টপ এন্ড সিরিজে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করা রহস্য স্পিনার মোহাম্মদ রুবেলকেও এশিয়ান গেমসের দলে দেখা যায়নি। পুরো সিরিজে ২৩ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হওয়া রুবেলের বাদ পড়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক।
বাশারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এশিয়ান গেমসের জন্য ৩০ সদস্যের স্কোয়াড তিন মাস আগেই জমা দিতে হয়েছিল। সেই সময় রুবেলের পারফরম্যান্স বর্তমানের মতো উজ্জ্বল ছিল না। ফলে পরবর্তীতে দলে পরিবর্তন করার সুযোগ ছিল না। পাশাপাশি দলে আলিস আল ইসলামকে রাখা হয়েছিল এবং রিশাদ হোসেন, শেখ মেহেদী হাসান ও নাসুম আহমেদের মতো স্পিনাররা ভালো করায় নতুন করে আরেকজন স্পিনার নেওয়ার সুযোগও ছিল সীমিত।
এদিকে এবারের বিপিএল মাঠে না গড়ানোয় নতুন ক্রিকেটারদের পর্যবেক্ষণের সুযোগ কমে যাওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে এ নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নন বাশার। তার আশা, ২০২৮ বিশ্বকাপের আগে পর্যাপ্ত ক্রিকেট খেলার সুযোগ তৈরি হবে। বিসিবি একটি টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। সেই টুর্নামেন্টে বেশি ম্যাচ হলে সেখান থেকে নতুন ক্রিকেটার খুঁজে নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে মনে করেন প্রধান নির্বাচক।
তবে বিপিএলকে ঘিরে প্রতিবছরের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের ক্রিকেটের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ভালো নয় বলেও মন্তব্য করেছেন বাশার। তার মতে, আইপিএল, পিএসএল কিংবা বিগ ব্যাশের মতো বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলো নিজেদের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। বাংলাদেশের বিপিএলকেও সময় নিয়ে একটি শক্ত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বড় বিদেশি ক্রিকেটাররা নিয়মিত ফিরলে প্রতিযোগিতার মান বাড়বে, একই সঙ্গে জাতীয় দলের জন্য আরও বেশি ক্রিকেটার পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
জাতীয় দলের পাইপলাইন শক্তিশালী করতে ‘এ’ দলের ম্যাচ বাড়ানোর উদ্যোগকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বাশার। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে সরাসরি জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া ক্রিকেটারদের মানিয়ে নিতে সময় লাগে। সেই জায়গায় ‘এ’ দলের আন্তর্জাতিক ম্যাচ তাদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। একইভাবে এইচপি দলের নিয়মিত খেলাও ভবিষ্যতের ক্রিকেটার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সামনে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের ‘এ’ দলের বিপক্ষে খেলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচক। নিয়মিত ‘এ’ দল ও এইচপির ম্যাচ আয়োজন করা গেলে জাতীয় দলের জন্য বড় একটি খেলোয়াড় পুল তৈরি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তিনি। বিশেষ করে এখন টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা বাড়ায় চোটের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই জাতীয় দলের জন্য বড় খেলোয়াড় পুল রাখা জরুরি বলে মনে করেন বাশার।



