বিপিএল এবার হচ্ছে না-খবরটি দেশের ক্রিকেটে যতটা হতাশার, ঘরোয়া ক্রিকেটারদের জন্য তার আর্থিক অভিঘাত ততটাই বড়। কারণ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের পারিশ্রমিক ছিল অনেক ক্রিকেটারের বছরের বড় একটি আয়ের উৎস। অথচ আগের আসর শেষ হওয়ার পরও অনেক ক্রিকেটার এখনো তাদের প্রাপ্য অর্থ বুঝে পাননি। পেমেন্ট জটিলতা, ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আর নানা বিতর্কের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত বিপিএল থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তের বাস্তবতা সামনে এসেছে।
তবে বিপিএল না থাকার অর্থ যেন ক্রিকেটারদের আয়ের পথও বন্ধ হয়ে না যায়, সেটিই এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গা থেকেই ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের সঙ্গে দুই দফা বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার বিসিবির পরিচালকদের সভা শেষে সেই পরিকল্পনারই বিস্তারিত জানিয়েছেন বোর্ড সভাপতি তামিম ইকবাল।
তামিমের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচ ফি বৃদ্ধি। শুধু হাতে গোনা কয়েকজন ক্রিকেটারকে সুবিধা দেওয়ার বদলে পুরো ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোতেই পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তামিম ইকবাল বলেন, ‘৬০ জন ক্রিকেটারের জন্য না সবার জন্য করব। নতুন একটা টুর্নামেন্ট হবে সব ম্যাচ বাড়বে। তবে আমি আসার পর একবার বাড়িয়েছিলাম অ্যাডহক কমিটিতে থাকা অবস্থায়। এরপর কিন্তু কোনো ম্যাচ হয়নি। নতুন করে আগামী চার দিনের ম্যাচে এখন থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাবে। ওয়ানডে ম্যাচ ১ লাখ টাকা, টি-টোয়েন্টিতে ৮০ হাজার টাকা।’
শুধু পুরুষ ক্রিকেটেই নয়, নারী ক্রিকেটের ম্যাচ ফিতেও বড় পরিবর্তন আসছে। তিন দিনের ম্যাচকে চার দিনের করার পাশাপাশি ম্যাচপ্রতি পারিশ্রমিকও বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন বিসিবি সভাপতি।
নারীদের ক্রিকেটে তিন দিনের ম্যাচ ছিল সেটা এখন চার দিনের হবে। আগে ছিল ২০ হাজার টাকা সেটা এখন ৪০ হাজার টাকা। ওয়ানডেতে ৩০ হাজার টাকা। টি-টোয়েন্টিতে ২০ হাজার টাকা।’
বিপিএল না থাকায় ঘরোয়া ক্রিকেটারদের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে বিসিবির পরিকল্পনা এখানেই থেমে থাকছে না। বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, একজন ক্রিকেটার ঘরোয়া ক্রিকেটের পুরো মৌসুম খেললে বছরে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারবেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি-নির্ভর একটি টুর্নামেন্টের ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটকেই নিয়মিত আয়ের বড় মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।
কোয়াবের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও সামনে এনেছেন তামিম। তার ভাষায়, ‘কোয়াবের সঙ্গে দুটি মিটিং হয়েছে। তারা একটা প্রস্তাব দেয় আমরা কাউন্টার প্রস্তাব দেই। পরে আমরা আবার বসি। এরপর সময় চাই যেন আমাদের নিজেদের মিটিংটা করে নিতে পারি। এখানে আসার আগে কোয়াবের সিনিয়রদের সঙ্গে আলাপ করেছি। সবাই অনেক খুশি। একজন খেলোয়াড় ঘরোয়া ক্রিকেটের পুরো সিজন খেললে বছরে ৩৫-৪০ লাখ টাকা করে পাবে।’
এদিকে বিপিএলের জায়গায় ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্যালেন্ডারে বড় পরিসরের একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আনার পরিকল্পনাও করছে বিসিবি। এতদিন যে প্রতিযোগিতাটি এনসিএল টি-টোয়েন্টি নামে পরিচিত ছিল, সেটিকে এবার ভিন্ন কাঠামো ও নামে আয়োজনের চিন্তা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য নাম ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’।
এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে দল গঠনের কাঠামোয়। বিভাগভিত্তিক দল না রেখে ছয়টি দল নিয়ে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দলগুলো কোনো প্রতিষ্ঠান কিনলে সেই প্রতিষ্ঠান নিজেদের পছন্দমতো দলের নাম দিতে পারবে। ফলে বিপিএলের বিকল্প হিসেবে একটি বাণিজ্যিক আবহের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি আয়োজনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
তামিমের বক্তব্যে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট-ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ডের সম্পর্কও নতুন করে গড়ে তুলতে চান তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটারদের বিভিন্ন দাবি, পারিশ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, সেটি দূর করার কথাও বলেছেন বিসিবি সভাপতি।
বিসিবি প্রধান আরও বলেন, ‘আমরা এখানে ক্রিকেটারদের সার্ভ করার জন্য এসেছি। আমাদের সঙ্গে ক্রিকেটারদের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। বরং ভালো হওয়া দরকার। কারণ অনেক সময় অনেক বেইজ্জতি করা হয়েছে ক্রিকেটারদের। আমার নতুন করে কিছু বলার দরকার নাই।’
ক্রিকেটারদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের জায়গাটিও তুলে ধরেছেন তামিম। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই যেহেতু ক্রিকেটার ছিলাম, ক্রিকেট খেলেছি তাদের সঙ্গে। তাদের ভালো-খারাপ কিছুটা হলেও বুঝার সামর্থ্য আল্লাহ আমাকে দিয়েছে। তাদের জন্য আমার যেটা করা দরকার হবে আমি তাই করবো। ক্রিকেটারদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। এটা ভালো হওয়ারই দরকার।’
বিপিএল না হওয়ার সিদ্ধান্ত তাই আপাতত বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটি শূন্যতা তৈরি করলেও বিসিবি সেটিকে ঘরোয়া ক্রিকেটের সংস্কারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। ম্যাচ ফি বৃদ্ধি, ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানো এবং নতুন নামে বড় টি-টোয়েন্টি আয়োজন-সব মিলিয়ে লক্ষ্য একটাই, বিপিএলের বাইরে থেকেও যেন দেশের ক্রিকেটারদের সারা বছর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট এবং সম্মানজনক আয়ের সুযোগ থাকে।



