ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত সিরিজটি নির্ধারিত সময়ে মাঠে গড়াচ্ছে না। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলতে ভারতের বাংলাদেশ সফরে আসার কথা থাকলেও ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি ও দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আপাতত সেই সফর হচ্ছে না। তবে সিরিজটি বাতিল হয়ে গেছে-এমন সিদ্ধান্তও এখনো নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল।
২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের বাংলাদেশ সফরে আসার কথা ছিল। দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেই সফর পিছিয়ে দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। তখন নতুন করে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সফরের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সূচি অনুযায়ী তিন ওয়ানডে ও তিন টি-টোয়েন্টির সিরিজ খেলার কথা ছিল দুই দলের। কিন্তু এক বছর পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূলে না আসায় সেপ্টেম্বরে সিরিজ আয়োজনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
তবে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের বক্তব্যে সিরিজ নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। ‘নট আউট নোমান’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, সিরিজ বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডই সিরিজটি আয়োজনের ব্যাপারে ইতিবাচক এবং নতুন একটি সময় বের করার চেষ্টা করছে।
তামিম বলেন, ‘ভারত সিরিজটি হবে না, এমন সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। তারপরও আমি আপনাদের একটি ছোট তথ্য দিই। দুই বোর্ডই আন্তরিকভাবে চায় যেন সিরিজটি হয়। বিসিসিআই ও বিসিবি, দুই পক্ষই সম্ভাব্য সময় বের করার চেষ্টা করছে, কখন এটি আয়োজন করা সম্ভব।’
নতুন একটি সময় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে বলেও জানান বিসিবি সভাপতি। তার মতে, ভারতের আগ্রহ নেতিবাচক হলে তিনি সিরিজটি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কথা বলতেন না। দুই বোর্ডেরই ইচ্ছা ইতিবাচক বলেই নতুন সূচির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তবে সিরিজ আয়োজনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিসিবির নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলেও পরিষ্কার করেছেন তামিম। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি উভয় দলের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচিও নতুন সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা। বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে একাধিক সিরিজ ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ থাকায় নতুন একটি উইন্ডো বের করা সহজ হচ্ছে না।
তামিম বলেন, ‘কিছু বিষয় আছে, যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিসিবি সভাপতি হিসেবে আমি কখনোই সেই লাইনটি অতিক্রম করতে চাই না। তবে দুই পক্ষেরই আগ্রহ ভালো এবং আমরা নিয়মিত যোগাযোগ করছি। তারিখ নিয়েও আলোচনা চলছে।’
ভারত-বাংলাদেশ সিরিজটি শুধু ক্রিকেটীয় সূচির ওপর নয়, দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। অতীতে রাজনৈতিক কারণে সিরিজ পিছিয়ে যাওয়ার পর এবার নতুন সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সবুজ সংকেত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তামিমও সেই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই মন্তব্য করেছেন।
ভারত সিরিজের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বিসিবির সামনে বড় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ফিক্সিং-সংক্রান্ত তদন্ত। এ ঘটনায় এরই মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজনের নাম প্রকাশ করেছে বোর্ড। আরও চার-পাঁচজনের নাম প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন তামিম। তবে আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের নাম প্রকাশ করছে না বিসিবি।
তামিম বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চার-পাঁচজনের নাম জানিয়েছি। আরও চার-পাঁচজনের নাম প্রকাশ করা হবে। এখানে স্বচ্ছতা ও সততার (ইন্টেগ্রিটি) একটি বিষয় রয়েছে। বিষয়টি এখন আইনজীবী দেখছেন। আইনজীবীর কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেলেই আমরা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নামগুলো প্রকাশ করব।’
তবে সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়া নিয়ে তামিমের মন্তব্য। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলেনি। আগের বিসিবি ও তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ালে বাংলাদেশের জায়গায় বিশ্বকাপে খেলেছে স্কটল্যান্ড।
মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মুস্তাফিজকে আইপিএলের কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন তামিম। এখনো সেই অবস্থানে অটল তিনি। তবে তার মতে, ওই ঘটনার প্রতিবাদ করা হলেও বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা করা উচিত ছিল।
তামিম বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিষয়টি আমরা আরও ভালোভাবে আলোচনা করতে পারতাম। মুস্তাফিজুরের বিষয়টি নিয়ে পুরো দেশই হতাশ হয়েছিল। আজও আমি বলছি, সেদিনও বলেছিলাম, এমনটা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না। এটি কোনোভাবেই সঠিক কাজ ছিল না। তখনও আমি এই অবস্থানকে সমর্থন করেছিলাম, এখনও করছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা একটি বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছিলাম।’
বাংলাদেশের বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার পর দেশের মানুষের উচ্ছ্বাসের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তামিম। তার মতে, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব না করার সিদ্ধান্তটি আরও সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
‘বিশ্বকাপে বাংলাদেশ প্রথমবার জায়গা করে নেওয়ার সময় দেশের প্রতিটি মানুষ কীভাবে উদ্যাপন করেছিল, তা আমরা সবাই দেখেছি। এখন হয়তো প্রতি দুই বছর পরপর কিংবা চার বছর পরপর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হয়, কিন্তু এটি একটি বিশ্বকাপ, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার কথা ছিল। তাই আমার মনে হয়, আমরা বিষয়টি আরও ভালোভাবে সামলাতে পারতাম। শুরু থেকেই আমরা এমন একটি পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম, যেখান থেকে আর ফিরে আসার সুযোগ ছিল না,’ বলেন তিনি।
বর্তমানে বিসিবি সভাপতি হওয়ার সুবাদে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) বোর্ড পরিচালকও তামিম। ফলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে আগের বোর্ডের সঙ্গে আইসিসির আলোচনার বিষয়গুলোও তার কাছে এসেছে। তবে সেসব আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করতে রাজি নন তিনি।
তামিম জানান, ‘আমি এখন আইসিসিতে আছি। বিসিবির কারণেই আমি আইসিসির একজন সদস্য (বোর্ড পরিচালক)। ওই আলোচনা-সমঝোতার সময় অনেক কিছু বলা ও করা হয়েছিল। সেগুলো যদি আমি প্রকাশ্যে বলি, আপনারা অবাক হয়ে যাবেন। কিন্তু আমি সেগুলো প্রকাশ করতে পারব না। কারণ আবারও সেই সম্মানের বিষয়টি সামনে আসে, আর সেই সম্মান আমাকে বজায় রাখতে হবে।’
বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের আগের অবস্থানও কিছুটা ব্যাখ্যা করেছেন তামিম। তার মতে, তখন যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাদের কাছে এমন কিছু তথ্য ছিল, যা বাইরে থাকা ব্যক্তিদের জানা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এখন বিভিন্ন আলোচনা ও ঘটনার বিষয় সামনে আসার পর তার মনে হয়েছে, পুরো পরিস্থিতি আরও কৌশলী ও সতর্কভাবে সামলানো যেত, ‘যারা তখন বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিলেন, তাদের কাছে সব ধরনের তথ্য ও উপাত্ত ছিল। এখন যখন শুনছি, এর সঙ্গে এই আলোচনা হয়েছে, এমন এমন ঘটনা ঘটেছে, সবকিছু বিশ্লেষণ করার পর আমার মনে হয়েছে, আমরা বিষয়টি আরও সতর্কভাবে, আরও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সামলাতে পারতাম।’



