[2:45 PM, 8/30/2026] Aapon Tariq: সাত ম্যাচে ২৩ উইকেট। পুরো টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১০ উইকেট বেশি। সাত ম্যাচের ছয়টিতেই অন্তত তিন উইকেট। সেমিফাইনালেও ৪ ওভারে ১৫ রান দিয়ে ৩ উইকেট।
মোহাম্মদ রুবেলের পারফরম্যান্সকে শুধু ‘ভালো’ বললে অবিচার হবে। ডারউইনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ এইচপি দলের একমাত্র ক্রিকেটার, যাঁর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব কম। বরং প্রশ্নটা এখন উল্টো-এই পারফরম্যান্সের পর তাঁকে জাতীয় দলের কাঠামোয় কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে?
কিন্তু রুবেলের ২৩ উইকেট যতটা উজ্জ্বল, তার আড়ালে এইচপির ব্যাটিংয়ের চিত্রটা ততটাই অস্বস্তিকর।
বাংলাদেশ এইচপি ছয় ম্যাচে পাঁচটি জিতে সেমিফাইনালে উঠেছে। ফলে ফলাফলকে ব্যর্থ বলা যাবে না। কিন্তু এই দলটির উদ্দেশ্য তো কেবল টুর্নামেন্ট জেতা নয়। এটি জাতীয় দলের দরজায় থাকা ক্রিকেটারদের পরীক্ষা করার জায়গা। সেই পরীক্ষায় কে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত, আর কে এখনও অনেক দূরে-সেটিই ছিল আসল প্রশ্ন।
ডারউইনের উত্তর খুব বেশি আশাবাদী নয়।
ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের সেরা রান সংগ্রাহক আরিফুল ইসলাম। সাত ম্যাচে ২১৯ রান, দুটি ফিফটি, স্ট্রাইকরেট ১৩৮.৬০। নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাটিং পারফরম্যান্স। তাকে নিয়ে নির্বাচকদের খাতায় ইতিবাচক কিছু লেখার যথেষ্ট কারণ আছে।
সাব্বির রহমানের ১৮৪ রানও উপেক্ষা করার মতো নয়। দুটি ফিফটি, স্ট্রাইকরেট ১২৪.৩২। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে-সাব্বিরের এই রান কি জাতীয় দলে ফেরার জন্য যথেষ্ট, নাকি তাকে আরও ধারাবাহিক হতে হবে?
কারণ সাত ম্যাচের একটি টুর্নামেন্টে কয়েকটি ভালো ইনিংস আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠা-দুটি এক জিনিস নয়।
আরিফুল ও সাব্বিরের পর যে শূন্যতাটা তৈরি হয়েছে, সেটিই এইচপির সবচেয়ে বড় সমস্যা।
জাতীয় দলের কাছাকাছি থাকা শামীম হোসেন ছয় ইনিংসে করেছেন ১০৭ রান। শুনতে খুব খারাপ নয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই সমস্যাটা ধরা পড়ে। তাঁর ১০৭ রানের ৫১-ই এসেছে একটি ইনিংসে। অর্থাৎ বাকি পাঁচ ইনিংসে মোট ৫৬ রান। টি-টোয়েন্টিতে এমন অনিয়মিত অবদান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত পারফরম্যান্সের দাবি করা কঠিন।
জিসান আলমের ছয় ম্যাচে ১০২ রানও খুব একটা স্বস্তি দিচ্ছে না। হাবিবুর রহমান সাত ম্যাচে করেছেন ৮৫। এই সংখ্যাগুলো হয়তো পুরোপুরি ব্যর্থতার প্রমাণ নয়, কিন্তু জাতীয় দলের পাইপলাইনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার মতোও নয়।
সবচেয়ে হতাশ করেছেন অধিনায়ক ইরফান শুক্কুর।
অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে তার কাছ থেকে শুধু নেতৃত্ব নয়, ব্যাট হাতেও দায়িত্বশীলতার প্রত্যাশা ছিল। ছয় ইনিংসে ৭২ রান সেই প্রত্যাশার ধারেকাছেও যায় না। সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল্ডেন ডাক-টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচে এসে ব্যর্থতার ছবিটাই আরও গাঢ় করেছে।
আর এখানেই এইচপি দলের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
যে দলের লক্ষ্য জাতীয় দলের জন্য ক্রিকেটার তৈরি করা, সেখানে ব্যাটিংয়ের দায়িত্ব কয়েকজনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল কেন? আরিফুল ব্যর্থ হলে কে ইনিংস টানবেন? শামীম বড় ইনিংস না খেললে কে রান করবেন? টপ অর্ডার ভেঙে গেলে মিডল অর্ডারের পরিকল্পনা কী?
সেমিফাইনাল এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছে খুব নির্মমভাবে।
ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে পাওয়ারপ্লেতে ৫৬ রান করার পরও ১৭.১ ওভারে ১০১ রানে অলআউট বাংলাদেশ। শুরুটা ছিল টি-টোয়েন্টির আদর্শ মডেলের মতো, শেষটা ছিল পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি-উইকেট পড়ার পর ইনিংস সামলানোর মতো ব্যাটার নেই।
অন্যদিকে বোলাররা দেখিয়েছেন, কখনো কখনো ১০১ রান নিয়েও ম্যাচ জেতার সুযোগ তৈরি করা যায়।
রুবেল ২৩ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা। রাকিবুল ইসলাম পাঁচ ম্যাচে ৯, রিপন মণ্ডল ছয় ম্যাচে ৮ এবং গাফফার সাকলাইন সাত ম্যাচে ৭ উইকেট নিয়েছেন। বোলিং বিভাগ অন্তত নির্বাচকদের সামনে কয়েকটি নাম রেখেছে।
বিশেষ করে রুবেলকে নিয়ে এখন আর ‘একটা ভালো টুর্নামেন্ট করেছে’ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। সাত ম্যাচের ছয়টিতে তিন বা তার বেশি উইকেট নেওয়া কাকতালীয় নয়। পাওয়ারপ্লেতে বল করার সক্ষমতা, উইকেট নেওয়ার ধারাবাহিকতা এবং রান আটকে রাখার দক্ষতা-তিনটি জায়গাতেই তিনি আলাদা নজর কেড়েছেন।
তবে এখানেও বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নয়। ফলে রুবেলের এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি জাতীয় দলের পারফরম্যান্সের সঙ্গে মেলানো যাবে না। কিন্তু তাঁকে আরও কঠিন পরীক্ষায় না পাঠানোরও কোনো যুক্তি নেই।
এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত সেটিই।
এইচপি দলের কাজ শুধু ট্রফি জেতা নয়, ক্রিকেটার চিহ্নিত করা। সেই হিসেবে ভিক্টোরিয়ার কাছে সেমিফাইনালে হারটাকে হয়তো খুব বড় ব্যর্থতা বলা যাবে না। বরং ১০১ রান করেও ম্যাচটাকে শেষ ওভার পর্যন্ত টেনে নেওয়া বোলারদের মানসিকতা প্রশংসার দাবিদার।
কিন্তু জাতীয় দলের পাইপলাইন নিয়ে যারা কাজ করবেন, তাদের জন্য ফলাফলের চেয়ে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের ধরনটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সেই হিসাবে ডারউইন থেকে সবচেয়ে জোরালো বার্তা এসেছে রুবেলের কাছ থেকে। আরিফুলও নিজের জায়গাটা শক্ত করেছেন। সাব্বির কিছুটা আলোচনায় ফিরেছেন। কয়েকজন বোলারও নিজেদের প্রমাণের সুযোগ নিয়েছেন।
কিন্তু শামীম, জিসান, হাবিবুর কিংবা ইরফান শুক্কুর-জাতীয় দলের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ক্রিকেটারদের কাছ থেকে যে ধারাবাহিকতা প্রত্যাশিত, ডারউইনে তার খুব বেশি দেখা মেলেনি।
তাই পাঁচ জয় দিয়ে এইচপির টুর্নামেন্টকে সফল বলে সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু তাতে আসল কাজটা হবে না।
এই দলের সাফল্য মাপা উচিত কত ম্যাচ জিতেছে দিয়ে নয়; বরং সাত ম্যাচ শেষে জাতীয় দলের জন্য নতুন করে কতজন নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার পাওয়া গেল, সেই হিসাব দিয়ে।
সেই হিসাবে রুবেল নিশ্চিতভাবেই আলোচনায়। আরিফুলও।



