বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ভবিষ্যৎ নিয়ে এবার যেন নতুন করে ভাবতে বসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। গেল দুই আসরের আর্থিক লোকসান, ফ্র্যাঞ্চাইজিদের নানা সংকট এবং ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতার পর তাড়াহুড়ো করে আরেকটি ‘জোড়াতালি’র টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে চাইছে না বোর্ড। বরং সময় নিয়ে পুরো কাঠামো ঢেলে সাজিয়ে বিপিএলকে একটি টেকসই ও পেশাদার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা সামনে এসেছে।
চলতি বছর বিপিএল আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। তবে সেটিকে বিপিএল বন্ধ হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং এক বছরের এই বিরতিকে সংস্কারের সুযোগ হিসেবেই দেখছেন তারা। নতুন মডেল, দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি-খেলোয়াড়-বিসিবির জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরির পরই মাঠে ফিরতে পারে বিপিএল।
বিপিএল ইস্যুতে আগামীকাল (রোববার) বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ক্রিকেটাররা। তার আগে আজ বিসিবি সভাপতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন গেল আসরের তিন ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজশাহী ওয়ারিয়র্স, ঢাকা ক্যাপিটালস এবং রংপুর রাইডার্সের মালিকপক্ষ। বৈঠকে বিপিএলের বর্তমান সংকট, ভবিষ্যৎ মডেল এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
গেল আসরের আর্থিক বাস্তবতাই যে এবারের সিদ্ধান্তের অন্যতম বড় কারণ, সেটি স্পষ্ট হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের বক্তব্যে। রংপুর রাইডার্সের সিইও ইসতিয়াক সাদেক মনে করেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে শুধু নামমাত্র একটি বিপিএল আয়োজন করে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করাই ভালো।
তিনি বলেন, ‘বাজারের পরিস্থিতি দিনকে দিন এত খারাপ হচ্ছে যে এটা আরও বেশি খারাপই হবে। সুতরাং শুধু নামমাত্র বিপিএল করে প্রতিশ্রুতি দিলাম ৩০ লাখ টাকা দেবো কিন্তু খেলোয়াড়কে আমি শেষ পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকা দিচ্ছি না, ফোন ধরছি না, হারিয়ে যাচ্ছি- এর চেয়ে বরং একটু সময় নিয়ে ভালো কোনো একটা মডেলে করাটাই ভালো।’
বিপিএলের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সংকট যে শুধু টুর্নামেন্ট চলাকালীন সীমাবদ্ধ থাকছে না, সেটিও উঠে এসেছে তার কথায়। গেল আসর শেষ হওয়ার পরও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু ক্রিকেটারের পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হয়নি বলে জানান তিনি।
তিনি আরও যোগ করেন, ‘জানুয়ারি মাস পার হয়ে আজ প্রায় সাত মাস আট মাস চলছে, আমাদের এখনো কিছু স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ের পারিশ্রমিক দেওয়া বাকি। কারণ আমাদের সঙ্গে যেসব পৃষ্ঠপোষক চুক্তি করেছিল তারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পারিশ্রমিকগুলো পরিশোধ করে না।’
এদিকে বিসিবির নতুন মডেলের পরিকল্পনাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে ঢাকা ক্যাপিটালস। ফ্র্যাঞ্চাইজিটির সিইও আতিক ফাহাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, পুরোনো কাঠামোয় বিপিএল আয়োজন হলে তারা আর থাকতে আগ্রহী নয়। তবে সংস্কারের পর নতুন কাঠামো তৈরি হলে সেই যাত্রায় থাকতে চায় তারা।
আতিক ফাহাদ বলেন, ‘বিসিবি বলেছে বিপিএলের নতুন মডেল তৈরি করে কমপক্ষে চার পাঁচ মাস আমাদের সময় দেওয়া হবে। যাতে করে আমরা উনাদের ক্রাইটেরিয়া ফুল ফিল করতে পারি। শেষ দুই বছরে যেভাবে বিপিএল হয়েছে এবারও সেভাবে হলে আমরা থাকবো না। বিপিএলে নতুন মডেল এলে আমরা থাকতে চাইবো। বিসিবি প্রেসিডেন্ট বলেছেন বিপিএল অবশ্যই হবে, তবে সময় চাচ্ছেন। বিপিএলের মান বাড়াতে তামিম ভাই ভালো একটা মডেল করতে চাচ্ছেন। ওনাকে আমরা সময় দিতে রাজি।’
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সও একই সুরে কথা বলছে। মাঠে বিপিএলের ধারাবাহিকতা চাইলেও আগের সমস্যাগুলো সমাধান করে একটি কার্যকর মডেল তৈরির পক্ষে তারা। দলটির সিইও মোকছেদুল কামাল বাবুর ভাষায়, বিপিএল এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই লাভবান হয়।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা মাঠে বিপিএল চাই। লিগের ধারাবাহিকতা থাকা দরকার। তবে যে সমস্যাগুলো ছিল, সেগুলোর সমাধান করাও দরকার। একটা ভালো মডেল তৈরি করা দরকার। যাতে করে, বিসিবি-ফ্ল্যাঞ্জাইজি-খেলোয়াড় সবার যেন লাভ হয়।’
বিপিএল নিয়ে বিসিবির সংস্কারের ভাবনায় সমর্থন জানিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। একইসাথে বিপিএলের সাথে দীর্ঘ যাত্রার অংশ হওয়ার আশা ব্যক্ত করেছেন দলটির কর্ণধার মোখছেদুল কামাল বাবু।
বিসিবির সঙ্গে বিপিএল সংস্কার নিয়ে বৈঠক শেষে এই ক্রিকেট সংগঠক বলেন, ‘আগামীতে বিপিএল যেন ভালোভাবে হয় এবং প্রফেশনালি দাঁড়াতে পারে, বিশ্বের অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ যেভাবে জায়গা করে নিয়েছে বিপিএলও যেন সেখানে জায়গা করে নিতে পারে- এসব নিয়ে আলোচনা ছিল। এ বছর বিপিএলে অনেকগুলো সংস্কার কার্যক্রম হবে। এরপর পরের বিপিএল হবে। সেসব কাজ করতে গিয়ে এ বছর বিপিএল করা সম্ভব না হলে পরের বছর হবে। বিপিএল বন্ধ হচ্ছে না। বিপিএলের সংস্কার হচ্ছে।’
তবে সংস্কারের পথে হাঁটতে গিয়ে একটি বিষয় নিয়ে আক্ষেপও আছে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের। সেটি হলো লিগের ধারাবাহিকতা। কারণ বিপিএল কেবল কয়েক সপ্তাহের একটি ক্রিকেট আয়োজন নয়; একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির কার্যক্রমকে ঘিরে সারা বছরই নানা প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা থাকে। ফলে এক বছরের বিরতি তাদের জন্য কিছুটা ব্যত্যয় তৈরি করবে বলেই মনে করেন রাজশাহীর এই কর্ণধার।
‘আমরা তো সবসময় চাই সবাই যেন উইন উইন সিচুয়েশনে থাকে। সবাই চাই বিপিএল আরও ভালো জায়গায় যাক। হতাশ বলতে, অবশ্যই চাই- লিগের ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধারাবাহিকতা না থাকলে… বিপিএল তো শুধু যখন খেলা হয় তখন না, এর বাইরেও দলগুলোর অনেক কাজ থাকে সারা বছর। সেই জায়গা থেকে ধারাবাহিকতা ভঙ্গ হওয়া কিছুটা হলেও ব্যত্যয়। তবে ভালোর জন্য এটা আমরা গ্রহণ করছি।’
বিপিএলের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে বিসিবির চুক্তি। এ বিষয়ে পুরোনো চুক্তির ধারাবাহিকতা নিয়েও আশাবাদী রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।
বাবু বলেন, ‘সেটা নিয়েও কথা হয়েছে। আমরা কোনো ব্যক্তির সাথে চুক্তি করিনি, চুক্তি হয়েছে বিসিবির সাথে। ৫ বছরের এগ্রিমেন্ট ছিল। বলেছেন, উনারাও ইতিবাচক। যারা নীতিমালা ফিলআপ করেছেন সেসব ফ্র্যাঞ্চাইজি অবশ্যই থাকবে।’
সব মিলিয়ে এবারের বিপিএল না হওয়ার সিদ্ধান্তকে সাময়িক বিরতি হিসেবেই দেখছে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। তাদের চাওয়া, প্রতিবছর তাড়াহুড়ো করে আয়োজনের বদলে বিপিএলকে একটি স্থায়ী কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো। যেখানে আর্থিক নিশ্চয়তা থাকবে, ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে না এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিরাও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকার সুযোগ পাবে।
বাবুর কথায় সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ছবিটিই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
‘আমরা একটা সাস্টেইনেবল মডেল দাঁড় করাতে চাই। ফ্র্যাঞ্চাইজি ও প্লেয়াররা যেন উপকৃত হতে পারে। লং টার্ম রোডম্যাপ। হুট করে আয়োজন হয়, তড়িঘড়ি করে প্রস্তুতি নেওয়া লাগে- এতে ভালো ফল আসে না। এজন্য ৫ বছর বা লম্বা সময়ের জন্য রোডম্যাপ আয়োজন করার কথা ভাবা হচ্ছে। এটা হলে বিপিএল রিমার্কেবল একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারবে।’



