জাপানে ক্রিকেট মাঠে নামার আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌতূহল হয়তো প্রতিপক্ষ নয়, উইকেট। এশিয়ার ক্রিকেটে ধীরে ধীরে পরিচিতি পাওয়া জাপান এখনো ক্রিকেটের বড় শক্তি হয়ে ওঠেনি। দেশটিতে ক্রিকেট অবকাঠামোও অন্য টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মতো সমৃদ্ধ নয়। তার ওপর এবারের এশিয়ান গেমসের আয়োজক শহর আইচি-নাগোয়া। সেখানে কেমন হবে ক্রিকেটের উইকেট, সেটি নিয়েই তাই স্বাভাবিক কৌতূহল বাংলাদেশের।
প্রশ্নটা উঠতেই অবশ্য সরাসরি উত্তর না দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাসির উপলক্ষ তৈরি করলেন জাতীয় দলের কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন। জাপানের উইকেট সম্পর্কে কতটা ধারণা আছে জানতে চাইলে তাঁর উত্তর, ‘উইকেট নিয়ে কোনো ধারণা নেই, কিন্তু কে বানিয়েছে জানি।’
রসিকতার কারণটাও বেশ চেনা। আইচি নাগোয়ার কো রোগি স্পোর্টস পার্কে যে মাঠে ক্রিকেট হবে, সেখানকার কিউরেটরের দায়িত্বে আছেন শ্রীলঙ্কার গামিনি ডি সিলভা। মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের কিউরেটর হিসেবে প্রায় দেড় দশক কাজ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পরিচয়। ফলে জাপানে অচেনা উইকেটের সামনে দাঁড়ালেও গামিনির উপস্থিতি কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে বাংলাদেশকে।
তবে গামিনি উইকেট বানাচ্ছেন বলেই সেটিকে বাংলাদেশের ঘরের মাঠ ভাবার সুযোগ নেই। নাগোয়ায় ক্রিকেট আয়োজনের জন্য তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী সুযোগ-সুবিধার মাঠ এবং সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে হাইব্রিড পিচ। কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক ঘাসের সমন্বয়ে তৈরি এই ধরনের উইকেটে খেলার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি নয়।
সালাহউদ্দীনও তাই গামিনির ওপর ভরসা রাখলেও উইকেটের চরিত্র নিয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে যেতে চান না। তাঁর ব্যাখ্যা, আবহাওয়াই শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখবে।
‘একেক দেশের আবহাওয়া একেক রকম। আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করবে আসলে উইকেটটা কী রকম হবে। গামিনিকে দোষ দিয়ে তো লাভ নেই। আমরা আসলে নিজেরাই বানাতে বলতাম এই ধরনের উইকেট।’
অর্থাৎ পরিচিত মুখ গামিনি থাকলেও অচেনা পরিবেশের পরীক্ষাটা থাকছেই। বাংলাদেশের জন্য সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এবার এশিয়ান গেমসে পাঠানো হচ্ছে নিয়মিত অধিনায়ক লিটন দাসের নেতৃত্বে মূল দল। ভারত, পাকিস্তানসহ অন্য দলগুলোর শক্তিশালী স্কোয়াডও এবারের প্রতিযোগিতাকে আগের চেয়ে কঠিন করে তুলেছে।
তার মধ্যেই রয়েছে আরেকটি বড় প্রশ্ন-টি-টোয়েন্টির ছন্দ কত দ্রুত ফিরবে বাংলাদেশে?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যস্ততা ছিল টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেট ঘিরে। কয়েকটি সিরিজ ধরে টি-টোয়েন্টি না খেলার কারণে এশিয়ান গেমসে সংক্ষিপ্ততম সংস্করণে দ্রুত মানিয়ে নেওয়াটাই এখন দলের অন্যতম বড় পরীক্ষা। সালাহউদ্দীনও সেটিকেই দেখছেন মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে।
‘কয়েকটি সিরিজ ধরে আমরা টি-টুয়েন্টি খেলছিলাম না। টি-টুয়েন্টির সঙ্গে কত তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিতে পারি, ছন্দটা আমরা কত তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারি- ছেলেদের এই একটাই বড় চ্যালেঞ্জ আছে।’
তবে চ্যালেঞ্জ যতই থাক, প্রত্যাশার জায়গাটা আরও বড়। এবার এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে ২২টি ডিসিপ্লিনে। এর মধ্যে ক্রিকেটকে ঘিরে বিশেষ প্রত্যাশা রয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার কারণে গেমসের পদক-প্রত্যাশার বড় অংশও যেন এসে পড়েছে ক্রিকেটারদের কাঁধে।
সালাহউদ্দীনের চোখেও তাই ক্রিকেট শুধু আরেকটি ডিসিপ্লিন নয়, দেশের প্রতিনিধিত্বের বড় মঞ্চ।
‘সবাই আশা করে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভালো করবে। আমরা সাধারণত খুব বেশি পদক পাই না। কিন্তু যেহেতু ক্রিকেট আছে, আমি মনে করি পুরো দেশ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে যে আমরা যেন ভালো করি।’
আশার জায়গা থেকে এবার লক্ষ্যটাও বেশ পরিষ্কার। শুধু ভালো খেলা নয়, সোনার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। ২০১০ সালে গুয়াংজু এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর প্রথম আসরেই স্বর্ণ জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর ২০১৪ ও ২০২৩ সালে এসেছে ব্রোঞ্জ। মেয়েদের দলও ২০১০ ও ২০১৪ সালে রুপা জেতার পর ২০২৩ সালে পেয়েছে ব্রোঞ্জ।
অতীতের সেই সাফল্যই হয়তো এবার প্রত্যাশার চাপটা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে চাপকে পাশ কাটিয়ে সালাহউদ্দীন বরং শিরোপার কথাই ভাবছেন।
‘আমি আশাবাদী আমরা ভালো করব। যেহেতু খেলাধুলা করতে এসেছি, এখানে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা চিন্তা করা ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নাই। আমরা আশা করব যে ছেলে ও মেয়েরা ভালো করবে এবং আমরা ভালো একটা ফল নিয়ে আসব।’
এবারের আরেকটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে গেমস ভিলেজে ক্রিকেটারদের আবাসন। অন্য ডিসিপ্লিনের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আগের আসরগুলোতে গেমস ভিলেজে থাকার অভিজ্ঞতা থাকলেও এবার মূল দল পাঠানোর পর আবাসন নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলও। বাংলাদেশের কোচ অবশ্য সেটিকে বড় করে দেখতে রাজি নন। তাঁর কাছে সুযোগ-সুবিধার চেয়ে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করাটাই বড়।
সব মিলিয়ে জাপানে বাংলাদেশের সামনে তাই একসঙ্গে কয়েকটি পরীক্ষা। অচেনা হাইব্রিড উইকেট, ভিন্ন আবহাওয়া, দীর্ঘ বিরতির পর টি-টোয়েন্টিতে ফেরা এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষ-সবকিছুর মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে নিজেদের সেরা ক্রিকেট।
বাংলাদেশ সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে খেলবে। ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় সেই ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কে হবে, সেটি নির্ধারিত হবে প্রথম পর্ব শেষে। জিততে পারলে ১ অক্টোবর সকাল ৯টায় প্রথম সেমিফাইনালে নামবে দল।



