এক প্রান্তে সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মিছিল, অন্য প্রান্তে অবিচল এক যোদ্ধা। ক্যারিবীয় বোলারদের সব আক্রমণ সামলে ব্যাট হাতে একাই লড়াই চালিয়ে গেলেন তাওহীদ হৃদয়। শুধু দলকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করাই নয়, নিজের ব্যাটে লিখলেন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন ইতিহাস। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলার পথে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন এই তরুণ ব্যাটার।
ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন হৃদয়। ৩৫৯ বলের ইনিংসে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কা হাঁকান তিনি। তাঁর এই অবিশ্বাস্য ইনিংসে ভর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে করা ৩৫৬ রানের জবাবে ৩৮৬ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। পায় ৩০ রানের লিড। অথচ একসময় ১৮৪ রানেই সাত উইকেট হারিয়ে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় ছিল স্বাগতিকেরা।
হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংসটি এখন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল মুশফিকুর রহিমের দখলে। ২০১৮ সালে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অপরাজিত ২১৯ রান করেছিলেন মুশফিক। আট বছর পর সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন হৃদয়।
টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটার হৃদয়। তার আগে এই কীর্তি ছিল মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের। মুশফিকের নামের পাশে রয়েছে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি, সাকিব ও তামিম করেছেন একটি করে। তবে এই তিনজনের কেউই ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে পারেননি। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে সেই অনন্য কীর্তি গড়লেন হৃদয়।
বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটেও বিরল তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। টেস্ট ইতিহাসে প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া ৪৫তম ব্যাটার হৃদয়। এই তালিকায় তার চেয়ে বেশি রান করতে পেরেছেন মাত্র ১১ জন। একই সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তিও এটি।
এক ইনিংসে ১১ ছক্কা, বাংলাদেশের নতুন রেকর্ড
ব্যাট হাতে ধৈর্যের পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি সুযোগ পেলেই ক্যারিবীয় বোলারদের সীমানাছাড়া করেছেন হৃদয়। ২২টি চারের সঙ্গে মেরেছেন ১১টি ছক্কা। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড এখন তাঁর দখলে। এর আগে এই রেকর্ড ছিল তামিম ইকবালের। ২০১৫ সালে খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে এক ইনিংসে সাতটি ছক্কা মেরেছিলেন তিনি।
বিশ্ব ক্রিকেটেও ১১ ছক্কার এই ইনিংসটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। টেস্টের এক ইনিংসে ১১টি ছক্কা মারা ব্যাটারদের বিরল তালিকায় যুক্ত হয়েছেন হৃদয়। তার আগে ছয়জন ব্যাটার এই কীর্তি গড়েছিলেন। এই তালিকায় সর্বোচ্চ ১২টি করে ছক্কার রেকর্ড ওয়াসিম আকরাম ও যশস্বী জয়সওয়ালের। শেষ দিকে তাসকিন আহমেদ আরও কিছুক্ষণ উইকেটে থাকলে সেই বিশ্বরেকর্ডের কাছাকাছিও যেতে পারতেন হৃদয়।
শুধু ছক্কা নয়, বাউন্ডারি থেকেও এসেছে বিশাল সংগ্রহ। ২২ চার ও ১১ ছক্কায় মোট ১৫৪ রান করেছেন তিনি। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এটি। এর আগে ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৭ রানের ইনিংসে ৩১টি চারের সাহায্যে বাউন্ডারি থেকে ১২৪ রান করেছিলেন সাকিব আল হাসান।
দলের ৬২.৬৯ শতাংশ রান একাই হৃদয়ের
হৃদয়ের ইনিংসের সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিসংখ্যানগুলোর একটি হলো দলের মোট সংগ্রহে তাঁর অবদান। বাংলাদেশের ৩৮৬ রানের মধ্যে একাই করেছেন ২৪২ রান। দলের মোট রানের ৬২.৬৯ শতাংশ এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে। একটি পূর্ণাঙ্গ ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ অবদানের রেকর্ডও এখন তাঁর।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল লিটন দাসের। ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৪৩ রানে অলআউট হওয়া ইনিংসে লিটন করেছিলেন ২৫ রান। দলের মোট সংগ্রহে তার অবদান ছিল ৫৮.১৩ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেন হৃদয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এখন হৃদয়ের ২৪২ রান। আগের রেকর্ডটি ছিল মাহমুদউল্লাহর। ২০১৮ সালে মিরপুরে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে ১৩৮ রান করেছিলেন তিনি।
এক দিনে সর্বোচ্চ রান, সাকিবকেও ছাড়িয়ে গেলেন হৃদয়
ব্যক্তিগত ইনিংসের পাশাপাশি এক দিনে সর্বোচ্চ রান করার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন হৃদয়। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ২৯ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি। তৃতীয় দিনে ব্যাট করতে নেমে একাই যোগ করেন আরও ২১৩ রান। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক দিনে কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ রান এটি।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল সাকিব আল হাসানের। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করার পথে এক দিনে ২১২ রান করেছিলেন তিনি। এবার এক রান বেশি করে সাকিবকে পেছনে ফেললেন হৃদয়।
সিলেটের মাঠেও একাধিক নতুন ইতিহাস
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডও এখন হৃদয়ের। ২০১৮ সালে টেস্ট অভিষেকের পর এই মাঠে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের ডাবল সেঞ্চুরি ছিল না। এতদিন সর্বোচ্চ ইনিংসটি ছিল মাহমুদুল হাসান জয়ের ১৭১ রান। এবার ২৪২ রান করে সেই রেকর্ড অনেকটা দূরে সরিয়ে দিলেন হৃদয়।
ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি শেষ দিকের ব্যাটারদের নিয়ে গড়া জুটিতেও নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন তিনি। ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারানোর পর তাইজুল ইসলামকে নিয়ে অষ্টম উইকেটে ১১৭ রান যোগ করেন হৃদয়। সিলেটের মাঠে বাংলাদেশের অষ্টম উইকেটে এটিই প্রথম শতরানের জুটি। দেশের টেস্ট ইতিহাসে এই উইকেটে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি।
এরপর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে নবম উইকেটে আরও ৮৫ রান যোগ করেন হৃদয়। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নবম উইকেটে বাংলাদেশের এটিই সর্বোচ্চ রানের জুটি।
তাইজুল ও তাসকিনের সঙ্গে গড়া এই দুই জুটির ওপর ভর করেই শেষ তিন উইকেটে ২০২ রান যোগ করে বাংলাদেশ। টেস্টে শেষ তিন উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহের নতুন রেকর্ড এটি। এর আগে ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ তিন উইকেটে ১৯৮ রান যোগ করেছিল বাংলাদেশ।
সমালোচনা থেকে রেকর্ডের নায়ক
হৃদয়ের এই ইনিংসের মাহাত্ম্য আরও বেড়েছে তার সাম্প্রতিক সময়ের প্রেক্ষাপটে। সিরিজের প্রথম টেস্টে দৃষ্টিকটুভাবে আউট হয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে ব্যাট হাতে সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন নিজের মতো করে। এক প্রান্তে উইকেট পড়লেও অন্য প্রান্তে দৃঢ়তা হারাননি। কখনো সতর্ক ব্যাটিং, কখনো দৃষ্টিনন্দন শট-সব মিলিয়ে সিলেটের উইকেটে নিজের সামর্থ্যের অনন্য প্রদর্শনী দেখিয়েছেন।



