মিরপুরে সমালোচনার ঝড়, আর সিলেটে ইতিহাসের জন্ম। মাত্র এক টেস্টের ব্যবধানে তাওহীদ হৃদয়ের গল্পটা যেন পুরোপুরি বদলে গেল। যে ব্যাটারকে নিয়ে আগের ম্যাচে উঠেছিল দায়িত্বহীনতার প্রশ্ন, সেই ব্যাটারই এবার বাংলাদেশের ক্রিকেটে লিখলেন নতুন এক অধ্যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিলেট টেস্টে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন হৃদয়। শুধু ব্যক্তিগত কীর্তি নয়, কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে বিপর্যয় থেকে টেনে তোলার অসাধারণ দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
টেস্ট ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় ম্যাচেই ডাবল সেঞ্চুরির স্বাদ পেয়েছেন হৃদয়। ৩০৪ বলে ১৯টি চার ও ৭টি ছক্কায় দুই শ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটার হয়েছেন এই তরুণ। এর আগে মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান এই কীর্তি গড়েছিলেন।
হৃদয়ের অর্জনকে বিশেষ করে তুলেছে আরও একটি বিষয়। নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে এমন ঘটনা এবারই প্রথম। ফলে ব্যক্তিগত মাইলফলকের পাশাপাশি রেকর্ড বইয়েও নিজের নামটি আলাদাভাবে লিখে রেখেছেন এই ব্যাটার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে দুই ইনিংসেই ব্যর্থ হয়েছিলেন হৃদয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে তার আউট হওয়ার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সমালোচকেরা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে এমন শট খেলার যৌক্তিকতা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
সেই সমালোচনার পর সিলেট টেস্টে হৃদয়ের সামনে ছিল নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ। মুমিনুল হকের অনুপস্থিতিতে একাদশে জায়গা পাওয়া এই ব্যাটার বুঝিয়ে দিয়েছেন, সুযোগ পেলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে তিনি প্রস্তুত। এবার তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে এমন এক ইনিংস, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
সিলেট টেস্টে বাংলাদেশের শুরুটা মোটেও স্বস্তির ছিল না। সাদমান ইসলামের চোটে একজন ব্যাটার কম নিয়ে ইনিংস শুরু করতে হয় দলকে। এরপর মাত্র ৫১ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৭৩ রানের জুটি গড়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন হৃদয়। পরে মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে যোগ করেন আরও ৪১ রান। কিন্তু মুশফিক, লিটন দাস ও মিরাজের বিদায়ে আবারও বিপর্যয়ে পড়ে স্বাগতিকেরা।
১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারানোর পর বাংলাদেশের ইনিংস বড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত ব্যাটারদের ওপর চাপ বাড়ে, কিন্তু হৃদয় ছিলেন ব্যতিক্রম। একের পর এক সতীর্থ সাজঘরে ফিরলেও তিনি নিজের জায়গায় অবিচল থেকেছেন। দলের প্রয়োজনে দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ছিল তাইজুল ইসলামের সঙ্গে হৃদয়ের জুটি। অষ্টম উইকেটে দুজনের দৃঢ় প্রতিরোধ বাংলাদেশকে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের হতাশ করে এই জুটি দলের সংগ্রহকে নিয়ে যায় নতুন উচ্চতায়।
হৃদয়ের ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও আক্রমণাত্মক মানসিকতার দারুণ সমন্বয়। কখনো কভার ড্রাইভ, কখনো পুল শট, আবার কখনো নিখুঁত টাইমিংয়ে বাউন্ডারি আদায় করেছেন তিনি। পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাটিংয়ের ধরন বদলানোর দক্ষতাও দেখিয়েছেন।
দ্বিতীয় দিন ৮০ বলে ২৯ রান নিয়ে অপরাজিত ছিলেন হৃদয়। প্রথম ৫০ রান পূর্ণ করতে খেলেছিলেন ১০৯ বল। এরপর ব্যাটিংয়ের গতি বাড়িয়ে পরের ৫০ রান করেন মাত্র ৬২ বলে।
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কতটা হিসাব করে নিজের ইনিংস সাজিয়েছেন তিনি। শুরুতে উইকেটে থিতু হওয়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন, পরে সুযোগ বুঝে আক্রমণ করেছেন। শতক পাওয়ার পরও থেমে যাননি। দেড় শ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ডাবল সেঞ্চুরির মাইলফলকে পৌঁছেছেন দৃঢ় প্রত্যয়ে।
মুমিনুল হকের ছিটকে যাওয়ায় সিলেট টেস্টে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন হৃদয়। আগের ম্যাচের ব্যর্থতার পর এই সুযোগ তার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে প্রমাণ করার পাশাপাশি সমালোচনার জবাব দেওয়ারও সুযোগ ছিল এটি।
সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি রাখেননি তিনি। নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ইনিংস খেলে বুঝিয়ে দিয়েছেন, টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ব্যাট করার সামর্থ্য তার রয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির চাপে ভেঙে না পড়ে দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতাও দেখিয়েছেন।
তাওহীদ হৃদয়ের এই ইনিংস বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়। একসময় যে দলের দুই শ রান পার হওয়াই কঠিন মনে হচ্ছিল, সেই দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ।
ক্রিকেটে একজন খেলোয়াড়ের সামর্থ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার মানসিক দৃঢ়তা। মিরপুরের ব্যর্থতার পর সিলেটে হৃদয় যে প্রত্যাবর্তন দেখালেন, তা তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন আত্মবিশ্বাস যোগাবে।
সামনে আরও অনেক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে এই তরুণ ব্যাটারের জন্য। তবে সিলেটের সবুজ গালিচায় ৩০৪ বলের এই মহাকাব্যিক ইনিংস তার ক্যারিয়ারে বিশেষ জায়গা নিয়ে থাকবে।



