অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শেষে গত রাতে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে যখন তাওহিদ হৃদয়ের হাতে তুলে দেওয়া হলো ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল ক্রিকেটার’-এর সম্মান, তখন সেটি ছিল একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একটি পোস্ট সেই অর্জনকে নিয়ে গেল অন্য এক আবেগঘন জায়গায়।
লাল রঙের নতুন গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে হৃদয় লিখেছিলেন, “মা, তোমার জন্য একটা গাড়ি কেনার নিয়ত করেছিলাম, তার কয়েক দিনের মধ্যেই পেয়ে গেলাম! অদ্ভুত না?”
কয়েকটি শব্দের সেই পোস্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকে দেখেছেন একজন সফল ক্রিকেটারের আবেগ, আবার অনেকে খুঁজে পেয়েছেন একজন সন্তানের কৃতজ্ঞতা। কিন্তু এই কয়েকটি লাইনের পেছনে লুকিয়ে আছে বহু বছরের সংগ্রাম, ত্যাগ আর না হার মানা এক মায়ের গল্প।
আজকের তাওহিদ হৃদয়কে দেখে হয়তো বোঝার উপায় নেই, তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পথ কতটা কঠিন ছিল। ছোটবেলায় বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার একটি একাডেমিতে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সংসারের আর্থিক বাস্তবতা তখন সেই স্বপ্নকে অনুমতি দিচ্ছিল না। পরিবারের পক্ষে ক্রিকেট একাডেমির খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না।
সেই সময় ছেলের চোখের স্বপ্নটা সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন তার মা। সংসারের শেষ সম্বল হিসেবে থাকা জমি বন্ধক রেখে তিনি টাকা জোগাড় করেন। ছেলেকে সেই টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দেন ঢাকায়। এমনকি বিষয়টি প্রথমদিকে জানতেনও না হৃদয়ের বাবা।
কিন্তু ভাগ্য তখনো হৃদয়ের পক্ষে ছিল না। ঢাকার বনশ্রীর একটি ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হয়ে প্রতারণার শিকার হন তিনি। হতাশ হয়ে একসময় ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। যে স্বপ্নের জন্য পরিবার এত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেটিই যখন ভেঙে যেতে বসেছে, তখন সামনে এগোনোর শক্তি খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না।
সেই কঠিন সময়েও পাশে ছিলেন তার মা। মায়ের ত্যাগ, মায়ের বিশ্বাস আর মায়ের স্বপ্নই তাকে আবার ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনে। এরপরের গল্প বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে পরিচিত। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট পেরিয়ে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দায়িত্বশীল ইনিংস খেলা এবং দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার হয়ে ওঠা-সবকিছুর পেছনেই ছিল সেই প্রথম বিশ্বাসের হাত।
হৃদয়ের জীবনে মা কেবল একজন অভিভাবক নন, তিনি যেন তার পুরো পৃথিবী। সেটি বিভিন্ন সময়ে তার আচরণেও স্পষ্ট হয়েছে। কয়েক বছর আগে জাতীয় দলের একটি ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার বদলে অসুস্থ মায়ের পাশে হাসপাতালে সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। তখন নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু হৃদয়ের কাছে সিদ্ধান্তটি ছিল সহজ। কারণ ক্রিকেট তাঁর পেশা হলেও, মাকে ঘিরেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় আবেগ।
বছর কয়েক আগে মাকে উদ্দেশ করে লেখা একটি খোলা চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেখানে তিনি মায়ের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই এবং নিজের মানসিক সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছিলেন।
হৃদয় লিখেছিলেন, “আমার মা, আমার জন্মদিনের দিন প্রথম খবর পাই তোমার ক্যান্সার। সেদিন প্রথম বুঝতে পারলাম পুরো পৃথিবীর বিনিময়ে হলেও আমার তোমাকেই দরকার। এরপর তোমার সেই কষ্টের পুরোটা জার্নি ছিলো আমার চোখের সামনে। তোমার ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে কতো চোখের পানি ফেলেছি তার হিসাব নেই।
তুমি ঘুম থেকে উঠে আমার চোখ ভেজা দেখবে বলে নিজেই আবার সেই চোখের পানি মুছেছি। তুমি ক্যান্সারের সাথে লড়াই করেছো, আমি প্রতিনিয়ত তোমাকে হারানোর ভয়ের সাথে লড়াই করেছি। কিন্তু এই শক্তির পুরোটাই যে পেয়েছি তোমাকে দেখে মা।
তোমাকে দেখে বুঝতে শিখেছি একজন নারীর কতোটা ত্যাগ করতে হয়, একজন মায়ের কতোটা পরিশ্রম করতে হয়, একজন মেয়ের কতোটা সৎ হতে হয়। তুমি যে আমার সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান! পরকালে মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত হলেও, এ দুনিয়ায় তোমার হাসিতে আমি বেহেশত দেখেছি। তুমি হাসি-খুশি থাকো, সুস্থ থাকো, প্রতিটি মোনাজাতে এটাই আমার সবথেকে বড় চাওয়া। ইতি তোমার বাবা।”
ক্রিকেটারদের সাফল্যের গল্পে সাধারণত আলোচনায় আসে রান, সেঞ্চুরি কিংবা ট্রফি। কিন্তু কিছু কিছু গল্প পরিসংখ্যানের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তাওহিদ হৃদয়ের গল্পও তেমনই। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে পাওয়া গাড়িটি হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি অর্জন। কিন্তু সেই গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে করা ছোট্ট পোস্টটি মনে করিয়ে দেয়, একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন অনেক সময় নিজের জন্য নয়, মায়ের জন্যই হয়।









Discussion about this post