ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। তবে অভিষেক ম্যাচেই এমন প্রভাব বিস্তার করার ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। সেই বিরল কীর্তিই গড়লেন হাসান মাহমুদ। কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে কেন্টের জার্সিতে প্রথমবার মাঠে নেমেই বল হাতে এমন এক পারফরম্যান্স উপহার দিলেন, যা শুধু ম্যাচের ফলই নির্ধারণ করেনি, একই সঙ্গে ইংলিশ ক্রিকেট অঙ্গনেও তাঁর নামটি আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে ব্ল্যাকপুলের স্ট্যানলি পার্কে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত কেন্ট জিতেছে ১৪০ রানের বড় ব্যবধানে। কিন্তু স্কোরকার্ডের বাইরেও ম্যাচটির গল্প মূলত একজন বোলারকে ঘিরে। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১০১ রানে ৯ উইকেট নিয়ে জয়যাত্রার প্রধান নায়ক হয়ে উঠেছেন হাসান।
প্রথম ইনিংসেই নিজের সামর্থ্যের আভাস দিয়েছিলেন বাংলাদেশের এই পেসার। ল্যাঙ্কাশায়ারের ব্যাটিং লাইনআপকে মাত্র ৮৭ রানে গুটিয়ে দিতে কেন্টের বোলাররা সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখলেও সবচেয়ে কার্যকর ছিলেন হাসান। ৩২ রানে ৩ উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কাজটি করেছিলেন তিনিই। সেই বোলিংয়ের ওপর ভর করেই প্রথম ইনিংসে ৯১ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড পায় কেন্ট।
এরপর ব্যাট হাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে দলটি। উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান ক্রিস বেঞ্জামিন মাত্র ৮৫ বলে ১০৪ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। ওপেনার হ্যারি ফিঞ্চও করেন ৮৬ রান। তাদের ব্যাটে ভর করে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৩২ রান তোলে কেন্ট এবং ল্যাঙ্কাশায়ারের সামনে দাঁড় করায় ৪২৪ রানের বিশাল লক্ষ্য।
এমন লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা অবশ্য খারাপ ছিল না ল্যাঙ্কাশায়ারের। ব্যাটসম্যানরা ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু নবম ওভারে বল হাতে এসে দৃশ্যপট বদলে দেন হাসান। অফ স্টাম্পের বাইরে নিখুঁত লাইনে করা এক ডেলিভারিতে হ্যারি সিংকে স্লিপে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন তিনি। সেই আঘাতই যেন ল্যাঙ্কাশায়ারের ইনিংসে প্রথম ফাটল তৈরি করে।
এরপর ধাপে ধাপে প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ভেঙে দেন তিনি। জশ বোহাননকে ফিরিয়ে দ্বিতীয় আঘাত হানার পর নিজের পরবর্তী স্পেলে এসে ভাঙেন কিটন জেনিংস ও মার্কাস হ্যারিসের শতরানের জুটি। ম্যাচের সেই সময়টায় মনে হচ্ছিল, ল্যাঙ্কাশায়ার হয়তো ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু হাসানের একের পর এক আক্রমণে সেই সম্ভাবনা দ্রুত মিলিয়ে যায়।
ল্যাঙ্কাশায়ারের বড় আশা হয়ে উঠেছিলেন ইংল্যান্ডের অলরাউন্ডার লিয়াম লিভিংস্টোন। অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও ৪৭ রানে তার ইনিংস থামিয়ে দেন হাসান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি বাংলাদেশের পেসারকে। জোসেফ মুরসকে আউট করে পূর্ণ করেন অভিষেক ম্যাচে পাঁচ উইকেট শিকারের কীর্তি। কিছুক্ষণ পর জর্জ বল্ডারসনকে ফিরিয়ে ইনিংসে নিজের ষষ্ঠ উইকেটও তুলে নেন।
এক পর্যায়ে ল্যাঙ্কাশায়ারের পতন হওয়া সাত উইকেটের ছয়টিই ছিল হাসানের দখলে। ম্যাচে ১০ উইকেট পাওয়ার সম্ভাবনাও জেগেছিল। কিন্তু নির্ধারিত স্পেল শেষ হয়ে যাওয়ায় আর বোলিংয়ে ফেরার সুযোগ হয়নি তার। শেষ তিন উইকেট তুলে নেন সতীর্থরা। ততক্ষণে অবশ্য ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত ২৮৩ রানে অলআউট হয়ে যায় ল্যাঙ্কাশায়ার। মার্কাস হ্যারিস ৯১ রানে অপরাজিত থাকলেও দলের হার এড়াতে পারেননি। আর হাসান শেষ করেন ৬৯ রানে ৬ উইকেট নিয়ে, যা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর প্রথম ছয় উইকেট শিকারের কীর্তি। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট তাঁর ক্যারিয়ারেরও সেরা বোলিং পারফরম্যান্স।
এই ম্যাচে ব্যক্তিগত আরেকটি অর্জনও যোগ হয়েছে তার ঝুলিতে। দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিংয়ের সময় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন হাসান। মাত্র ৩৫ ম্যাচে তাঁর উইকেটসংখ্যা পৌঁছে গেছে ১০৪-এ। ফলে কাউন্টি অভিষেক শুধু একটি সফল ম্যাচ নয়, তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে।










Discussion about this post