বাংলাদেশ নারী দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলমের আনা যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্ত শেষে স্বাধীন তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছে জমা দিয়েছে। থিসিস পেপারের আদলে বাঁধাই করা দুটি বই আকারে প্রস্তুত এই প্রতিবেদনটি গতকাল বিকেলে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের হাতে তুলে দেন কমিটির সদস্যরা।
তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি তারিক উল হাকিম। তার সঙ্গে কমিটির সদস্য হিসেবে ছিলেন ব্যারিস্টার মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান খান, ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা, অধ্যাপক ড. নাঈমা হক এবং বিসিবির পরিচালক ও মহিলা উইংয়ের প্রধান রুবাবা দৌলা। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এটি কোনো একাডেমিক গবেষণা নয়; বরং অভিযোগ, সাক্ষ্য ও নথিপত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রস্তুত একটি তদন্ত প্রতিবেদন।
গত ৭ নভেম্বর একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাহানারা আলম প্রথম প্রকাশ্যে নারী দলের সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। বিষয়টি সামনে আসার দুদিন পর, ৯ নভেম্বর বিসিবি অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে। শুরুতে তিন সদস্যের এই কমিটিতে পরে আরও দুজন যুক্ত হন।
প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল, তদন্ত কমিটি ১৫ কর্মদিবসের মধ্যেই তাদের প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দেবে। তবে জাহানারা আলম লিখিত অভিযোগ জমা দিতে সময় চাওয়াসহ তদন্তের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে সময়সীমা একাধিকবার বাড়ানো হয়। ২ ডিসেম্বর প্রথম দফায় সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানায় বিসিবি। পরে আরও দফা বাড়িয়ে জানানো হয়, ৩১ জানুয়ারির মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত তিনবার সময় বাড়ানোর পর নির্ধারিত সময়েই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলো।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত বিষয়বস্তু এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগ যেভাবে আলোড়ন তুলেছিল, তদন্তে তার সব অংশ সমানভাবে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগের বেশির ভাগ ঘটনাই ২০২১ সালের হওয়ায় বর্তমান বোর্ড সে সময়ের দায়ভার সরাসরি নেবে না বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও যেসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ মিলেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী বিসিবি। বোর্ড সূত্র জানায়, আজকালের মধ্যেই প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ বা গুরুত্বপূর্ণ অংশ গণমাধ্যমকে জানানো হতে পারে।
এদিকে এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিয়ে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দেশের নারী ক্রিকেটারদের জন্য নিরাপদ, হয়রানিমুক্ত ও জেন্ডার সংবেদনশীল ক্রীড়া পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিসিবিসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে এই রুল জারি করেন। একই সঙ্গে আদালত হাইকোর্টের পূর্ববর্তী রায় ও নির্দেশনার আলোকে বিসিবিতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর প্রক্রিয়া ও কমিটি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ আদালতকে জানাতে বলেছেন।
কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট যে নীতিমালা ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেটির বাস্তবায়ন নিয়েও এই রুলে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ৯ নভেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সংযুক্ত করে শুটার সাবরিনা সুলতানা জনস্বার্থে এই রিট আবেদন করেন।
রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম ও সালেহ আকরাম সম্রাট। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আবদুল করিম। আইনজীবী নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম জানান, রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায়ই হাইকোর্ট অন্তর্বর্তী নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে যৌন হয়রানি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং নারী ক্রিকেটারদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।










Discussion about this post