বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নির্বাচন যেন নির্বাচনের আগেই শেষ হতে বসেছে! যাচাই-বাছাই শেষে যেখানে ৫০ জন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হয়েছিল, সেখানে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে এসে একঝাঁক প্রার্থীর সরে দাঁড়ানো বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। ফলে এখন ২৫টি পরিচালক পদের জন্য নির্বাচনে রয়েছেন মাত্র ৩৩ জন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. শেখ জোবায়েদ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ’সবাই ব্যক্তিগত কারণে সরে দাঁড়িয়েছেন।’ কথাটা যেমন সহজ, তার পেছনের ব্যাখ্যাটা ততটাই জটিল। ‘ব্যক্তিগত কারণ’ শব্দটা যেন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এখন এক বহুল ব্যবহৃত কূটনীতি। এক কথায়, অনেক কিছু বলেও কিছু বলা হয় না।
বিশেষ করে নজর কাড়ছে ক্যাটাগরি-২, অর্থাৎ ঢাকার ক্লাবভিত্তিক নির্বাচন। এখানে ৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে একদিনেই ১৩ জন সরে দাঁড়ালেন! এতটা ‘ব্যক্তিগত’ সিদ্ধান্ত কি কাকতালীয়? নাকি অন্য কোথাও লেখা হয়েছিল এই স্ক্রিপ্ট?
অভিযোগ আছে, ঢাকার ক্লাবগুলো সরকারের পক্ষপাতিত্বে বিরক্ত। কারা নির্বাচন করবেন, কোন ক্লাব ভোট দিতে পারবে, কার প্রার্থিতা টিকবে-সবকিছু যেন আগেই ‘ধার্য’ করে দেওয়া। একে তো আদালতের নিষেধাজ্ঞা, তার উপর প্রশাসনিক চাপ-সব মিলিয়ে অনেকে বলছেন, এটি আর নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, বরং এক ধরনের ম্যাচ ফিক্সিং।
ঢাকার নামী কিছু ক্লাবের প্রতিনিধি যেমন তামিম ইকবাল, রফিকুল ইসলাম বা মাসুদুজ্জামান যেভাবে মনোনয়ন তুলে নিয়েছেন, তাতে বোঝা যায়, বোর্ড নির্বাচন এখন আর কেবল ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের বিষয় নয়। এখানে রাজনীতি, পৃষ্ঠপোষকতা আর ‘লয়্যালটি’ বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, জেলা ও বিভাগীয় ক্যাটাগরি-১–এ দৃশ্যপট আরও সরল। এখানেও নির্বাচন হওয়ার আগেই ৬ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। খুলনার আব্দুর রাজ্জাক, বরিশালের শাখাওয়াত হোসেন কিংবা চট্টগ্রামের আসিফ আকবর-তারা ভোটারদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগই পাননি। কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বীই থাকেননি। চট্টগ্রাম-রাজশাহী থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহারের ফলে তাদের পথ আরও সহজ হয়ে গেছে।
এখন নির্বাচনী লড়াই কেবল কয়েকটি স্থানে-ঢাকা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ। আর ক্যাটাগরি-৩–এ মাত্র দুইজন প্রার্থী। এখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রার্থী মনোনয়ন তুলে নেওয়ায় খালেদ মাসুদ পাইলট ও জাহাঙ্গীরনগরের দেবব্রত পাল মুখোমুখি হবেন।
তবে এসব গাণিতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়-যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না, সেখানে নির্বাচন কি থাকে? যেখানে প্রার্থী সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন, সেখানে স্বতঃস্ফূর্ততা কীভাবে আসে? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বোর্ডের নেতৃত্ব কি আদৌ পুরো ক্রিকেট কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব করছে?
অর্থনৈতিকভাবে এক নম্বরে থাকা একটি দেশের ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচন যদি আগেভাগেই ‘ফেরেস্তা’দের দিয়ে সাজিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে বাকি যারা মাঠে নেমে খেলতে চায়, তাদের কী হবে?
৬ অক্টোবর ভোট হবে ঠিকই। ব্যালট বাক্স থাকবে, ভোটাররা যাবেন, ফলাফলও আসবে। কিন্তু যারা ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য সত্যিকারের যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই তো আগেই মাঠ ছেড়ে দিয়েছেন।
বিসিবি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন যারা-
ক্যাটাগরি-১ (জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা)
ঢাকা বিভাগ-
আমিনুল ইসলাম বুলবুল (ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা)
নাজমূল আবেদীন (ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থা)
এস এম আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদুয়ান (জামালপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা)
রাজশাহী বিভাগ-
হাসিবুল আলম (রাজশাহী বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা)
মুহাম্মদ মুখলেসুর রহমান (চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থা)
এস এম শামস মতিন (জয়পুরহাট জেলা ক্রীড়া সংস্থা)
রংপুর বিভাগ
মো. হাসানুজ্জামান (রংপুর বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা)
মো. রেহাতুল ইসলাম খোকা (দিনাজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা)
মো. নূর-এ-শাহাদাৎ স্বজন (ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রীড়া সংস্থা)
ক্যাটাগরি-২ (ঢাকার ক্লাব)
মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ)
ইসতিয়াক সাদেক (ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাব)
আদনান রহমান দীপন (রূপগঞ্জ টাইগার্স ক্রিকেট ক্লাব)
ফায়াজুর রহমান (উত্তরা ক্রিকেট ক্লাব)
আবুল বাশার (প্রাইম দোলেশ্বর স্পোর্টিং ক্লাব)
আমজাদ হোসেন (ঢাকা স্পার্টানস ক্রিকেট ক্লাব)
শানিয়ান তানিম নাভিন (ঢাকা মেরিনার ইয়াংস ক্লাব)
একেএম আহসানুর রহমান মল্লিক (ইয়ং প্যাগাসাস ক্লাব)
মোহাম্মদ মোখছেদুল কামাল (গোল্ডেন ঈগলস স্পোর্টিং ক্লাব)
মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান ভুঞা (ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব)
এম নাজমুল ইসলাম (ট্যালেন্ট হান্ট ক্রিকেট একাডেমি)
ফারুক আহমেদ (রেঞ্জার্স ক্রিকেট একাডেমি)
মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদ (কাঁঠালবাগান গ্রিন ক্রিসেন্ট ক্লাব)
মো. রাকীব উদ্দিন (এইস ওয়ারিয়র্স)
মো. মনজুর আলম (রেগুলার স্পোর্টিং ক্লাব)
মেহরাব আলম চৌধুরী (যাত্রাবাড়ী ক্রীড়া চক্র)
ক্যাটাগরি-৩ (সাবেক ক্রিকেটার এবং অধিনায়ক, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা)
দেবব্রত পাল (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়)
খালেদ মাসুদ পাইলট (সাবেক ক্রিকেটার)










Discussion about this post