মেহেদি হাসান মিরাজ যখন টেলিভিশনের পর্দায় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় দেখেছিলেন, তখন তার বয়সও আট হয়নি। ২০০৫ সালের কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর সেই স্মৃতি এখনো স্পষ্ট তার মনে। দুই দশকের বেশি সময় পর ইতিহাস যেন আবারও ফিরে এসেছে। তবে এবার দর্শক হিসেবে নয়, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবেই ছিলেন তিনি।
মিরাজের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। শুধু একটি ম্যাচ নয়, পুরো সিরিজ নিজেদের করে নেওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। টানা চারটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয়ও দেখিয়েছে, দলটি ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট পথে এগোচ্ছে। তবে অধিনায়ক মিরাজের চোখে এসব অর্জন শেষ গন্তব্য নয়, বরং বড় লক্ষ্য পূরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
কয়েক মাস আগেও বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা পাওয়ার সমীকরণ তখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। র্যাঙ্কিংয়ের অবস্থান এবং ধারাবাহিকতার অভাব নিয়ে ছিল শঙ্কা। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউ জিল্যান্ডের পর এবার অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূরে সরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করতে পারলে র্যাঙ্কিংয়ে আরও বড় অগ্রগতির সুযোগ ছিল। ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলে আট নম্বরে ওঠা কিংবা সাত নম্বরের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি। তবু ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলকে হারিয়ে যে আত্মবিশ্বাস এবং সম্মান অর্জন করেছে বাংলাদেশ, সেটিকেই বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন মিরাজ, ;সব মিলিয়ে আমি সন্তুষ্ট। অধিনায়ক হিসেবে অবশ্যই আমার কাছে ভালো লাগার জিনিস এগুলো। পাশাপাশি, যারা ক্রিকেট খেলা দেখছে এবং আপনারা যারা আছেন, সবাই ভালো অনুভব করছে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিপক্ষে যদি আমরা ভালো খেলতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য একটা বিরাট সুযোগ থাকে।”
মিরাজ মনে করেন, মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিপক্ষের সম্মান অর্জন করা। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের ক্রিকেটাররা যখন বাংলাদেশের প্রশংসা করেন, তখন সেটি উন্নতির স্পষ্ট প্রমাণ।
“তারা কিন্তু আমাদেরকে নিয়ে কথা বলছে, প্রশংসা করছে বোলারদেরকে নিয়ে, ব্যাটসম্যানদেরকে নিয়ে এবং তাদেরকে যে আমরা কঠিন সময়টা দিচ্ছি, সেটা নিয়ে তারা আমাদেরকে সেই সম্মানটা দিচ্ছে। এটা অবশ্যই উন্নতির একটা লক্ষণ এবং আশা করি, এভাবে যদি চালিয়ে করতে পারি, আরও ভালো একটি দল হবে।”
গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্যের পথচলা এবার পৌঁছেছে নতুন উচ্চতায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ করার পর পাকিস্তান ও নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষেও সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়কে আলাদা করে দেখছেন মিরাজ।
কারণ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ওয়ানডে দলকে হারানোর অনুভূতি অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বিশেষ।
“এটা অবশ্যই অনেক স্পেশাল। কারণ অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আগে আমরা কখনোই সিরিজ জিতিনি। একটা ম্যাচ আমরা হয়তো জিতেছিলাম, সেই ২০০৫ সালে। আমি অনেক ছোট ছিলাম, আমি দেখেছিলাম ম্যাচটা। আমার এখনও মনে আছে। এবার যেহেতু আমরা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সিরিজ জিতেছি, এটা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বিরাট একটা অর্জন।”
তবে সিরিজ জয়ের চেয়েও বড় একটি অর্জনের কথা উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সম্মান আদায় করে নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ‘আরও সবচেয়ে বড় অর্জন এটাই মনে করি যে, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা আমাদেরকে নিয়ে প্রশংসা করছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে এবং বাংলাদেশের কন্ডিশন নিয়ে, উইকেট নিয়ে, ক্রিকেটারদেরকে নিয়ে। এটা আমাদের একটা বিরাট অর্জন।’
সাম্প্রতিক সাফল্য নিয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ দেখছেন না মিরাজ। বরং তিনি মনে করেন, গত এক বছরে দলের উন্নতি এসেছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল হিসেবে। বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপকে সামনে রেখেই দল গঠনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি, ‘আমাদের কিন্তু দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। গত এক বছরে আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। এটা আসলে একদিনে সম্ভব নয়। এর আগেও বলেছি, একটা দল যখন আমরা (গঠন) করি, তখন অবশ্যই আমাদের একটা পরিকল্পনা থাকে যে, আমরা কীভাবে দলটাকে বানাব এবং কী কম্বিনেশনে আমরা খেলব।’
দলের বিভিন্ন ক্রিকেটারকে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় খেলানো, নির্দিষ্ট পজিশনে দীর্ঘ সময় সুযোগ দেওয়া এবং সম্ভাব্য কম্বিনেশন তৈরি করার প্রক্রিয়া চলেছে বেশ কিছুদিন ধরেই। মিরাজের ভাষায়, এসব সিদ্ধান্তের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতের বড় টুর্নামেন্ট, ‘গত এক বছর আমরা ওভাবেই পরিকল্পনা করেছি, সামনে আমাদের বিশ্বকাপ আছে, কোন পজিশনে কাকে সেট করব এবং কোন পজিশনে একটা ক্রিকেটারকে অনেক বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ দেব। এটা আমরা করেছি এবং বিভিন্ন সময় আপনারাও দেখেছেন যে, বিভিন্ন পজিশনেও খেলতে হয়েছে অনেক ক্রিকেটারকে। এটা শুধু আমাদের (দ্বিপাক্ষিক) সিরিজ না, সামনে যে বিশ্বকাপ বা এশিয়া কাপ আছে, সেটাকে লক্ষ্য করেই আমরা এগোতে চাচ্ছি এবং সেই পরিকল্পনাগুলো সাজাচ্ছি এবং আশা করি যে, আমরা ভালো একটা দলে পরিণত হয়েছি এখন।’
বাংলাদেশ ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের একটি আক্ষেপ রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সিরিজে সাফল্য এলেও বিশ্বকাপ কিংবা এশিয়া কাপের মতো বড় আসরে সেই সাফল্যের প্রতিফলন খুব কমই দেখা গেছে। মিরাজের নেতৃত্বাধীন দল সেই আক্ষেপ ঘোচানোর স্বপ্নই দেখছে। অস্ট্রেলিয়াকে হারানো তাই তাদের কাছে শেষ অর্জন নয়, বরং আরও বড় কিছুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস।









Discussion about this post