দক্ষিণাঞ্চলের ক্রিকেট মানচিত্রে একসময় বেশ পরিচিত নাম ছিল খুলনা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উত্তাপ ছড়িয়েছে এই মাঠে, গ্যালারিতে উঠেছে দর্শকের ঢেউ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ব্যস্ততা থেমে গেছে। এক দশক ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তো নয়ই, জাতীয় পর্যায়ের বড় কোনো ম্যাচও নিয়মিত পাচ্ছে না খুলনা বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম।
বরিশালের গল্প আরও দীর্ঘ অপেক্ষার। কীর্তনখোলা নদীর পাড়ের জীবনানন্দ দাস ক্রিকেট স্টেডিয়াম দীর্ঘ ২১ বছর ধরেই অনেকটা নিস্তব্ধ। ১৯৬০ সালে নির্মিত এই মাঠ কখনো আন্তর্জাতিক মানের ভেন্যুর স্বীকৃতি পায়নি। একসময় জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচও বন্ধ হয়ে যায় সেখানে।
তবে দুই শহরের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এবার দৃশ্যপট বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নতুন একটি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনায় খুলনা ও বরিশালকে ভেন্যু হিসেবে ভাবছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। টুর্নামেন্টটির সম্ভাব্য নাম ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অন্তত গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দুটি মাঠে আয়োজন করা হতে পারে। সেমিফাইনাল ও ফাইনালের ভেন্যু এখনো চূড়ান্ত হয়নি; সিলেটকে সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ও বিসিবি পরিচালক সিরাজউদ্দিন আলমগীর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নতুন টুর্নামেন্টটির গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খুলনা ও বরিশালে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেমিফাইনাল ও ফাইনাল নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সম্ভাব্য সূচি অনুযায়ী, টুর্নামেন্টটি আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে অথবা জানুয়ারির শুরুতে মাঠে গড়াতে পারে। তবে তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
খুলনা বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়েছিল ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চার ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ হয়েছিল এখানে, যেখানে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে সিরিজটি ২-২ ব্যবধানে শেষ করে।
এরপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজা খুলনার জন্য আর খোলেনি। নিয়মিত জাতীয় ক্রিকেট লিগের চার দিনের ম্যাচ হলেও বড় কোনো জাতীয় টুর্নামেন্টের ম্যাচ থেকে অনেকটাই দূরে ছিল মাঠটি। সবশেষ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ও দক্ষিণ আফ্রিকা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ হয়েছিল খুলনায়।
এবার তাই শুধু ম্যাচ আয়োজন নয়, মাঠটিকে নতুন করে প্রস্তুত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বিসিবির খুলনা জেলা বিভাগ থেকে নির্বাচিত পরিচালক শান্তনু ইসলাম সুমিত জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে তারা মাঠ পরিদর্শনে যাবেন। দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দর্শকদের মাঠমুখী করতে গ্যালারিতেও পরিবর্তনের চিন্তা আছে। আধুনিক মানের স্ট্যান্ড বসানোর পরিকল্পনা করছে বিসিবি। অর্থাৎ শুধু মাঠে খেলা ফেরানো নয়, দর্শকের অভিজ্ঞতাকেও নতুন করে সাজাতে চায় বোর্ড।
খুলনা ভেন্যুর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্টেডিয়াম উন্নয়নের প্রকল্প বিসিবি থেকে অনুমোদিত হয়েছে। বিসিবির প্রকৌশলী ও পরামর্শকেরা মাঠ পরিদর্শনও করে গেছেন। তবে এখনো মূল কাজ শুরু হয়নি।
বরিশালের জীবনানন্দ দাস ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অপেক্ষাটা আরও দীর্ঘ। ১৯৬০ সালে নির্মিত এই মাঠ দীর্ঘদিন ধরে বড় ক্রিকেট থেকে বিচ্ছিন্ন। ২০২২ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উদ্যোগে স্টেডিয়ামটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। সেই সংস্কারকাজ এখন প্রায় শেষের পথে।
ফলে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কীর্তনখোলা নদীর পাড়ের মাঠটি। স্টেডিয়ামের কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, বিসিবির নতুন ঘরোয়া টুর্নামেন্ট দিয়েই মাঠে ফিরতে পারে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট।
বরিশালে জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচও একসময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই নতুন টুর্নামেন্টের ম্যাচ আয়োজন শুধু একটি ক্রিকেটীয় আয়োজন নয়, শহরটির ক্রিকেট সংস্কৃতিতেও নতুন প্রাণ ফেরানোর সুযোগ।
খুলনা ও বরিশালের স্টেডিয়ামের গল্পে মিল আছে একটি জায়গায়-দুটি মাঠই ক্রিকেট আয়োজনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন বড় ম্যাচের অপেক্ষায় ছিল। এবার বিসিবির নতুন টুর্নামেন্ট সেই অপেক্ষার অবসানের একটি দরজা খুলে দিচ্ছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের ক্রিকেটপ্রেমীরা দীর্ঘদিন পর ঘরের মাঠে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট দেখার সুযোগ পাবেন। খুলনায় ফিরবে বড় ম্যাচের আবহ, আর বরিশাল পেতে পারে দীর্ঘ ২১ বছর পর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের নতুন সূচনা।
তবে সবকিছু এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে। মাঠের সংস্কার ও অবকাঠামোগত কাজ কত দ্রুত শেষ হয়, সেটিই ঠিক করবে ডিসেম্বরের শেষ কিংবা জানুয়ারির শুরুতে দক্ষিণাঞ্চলের দুই শহরে সত্যিই ক্রিকেটের নতুন মৌসুম শুরু হবে কি না।



