চলতি বছর ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি বাংলাদেশ। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি। বিষয়টি নিয়ে কারণ উদঘাটনে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন আসিফ নজরুল।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না যাওয়ার কারণ উদঘাটনে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন কমিটির প্রধান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ কে এম ওয়ালী উল্লাহ।
কমিটির অপর দুই সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।
২২ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার দায় কার-সে বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিবেদনের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত কোনো একজন ব্যক্তির নেওয়া উচিত নয়।
তবে প্রতিবেদনে ‘একজন ব্যক্তি’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করা না হলেও সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর জানান, তারা তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকেই বোঝাতে চেয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিজের ফেসবুক পোস্টে আসিফ নজরুল স্পষ্ট করে জানান, বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্তটি তারই ছিল। তিনি লিখেছেন, ‘ ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তখনকার ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মূলত আমারই ছিল। আমি নিজেই এ কথা একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছি। তাই এতোদিন পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিষয়টি তদন্ত করে তা প্রকাশের কি এমন কারণ ঘটলো বুঝলাম না।’
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আসিফ নজরুল মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে প্রসঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ ঘটনার সূত্রপাত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে অপমানজনকভাবে বাদ দেওয়া থেকে। এর পরপরই আমরা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এবং বাংলাদেশের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার বিষয়ে অনীহা জানাই।’
বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেটি অমূলক ছিল না বলেও দাবি করেছেন আসিফ নজরুল। এ বিষয়ে তিনি আইসিসির একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ আমাদের আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, আইসিসির প্রথম রিপোর্টেই তার স্বীকৃতি ছিল। সেখানে ভারতে নিরাপত্তা-আশঙ্কার তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল—বিশ্বকাপের দলে মুস্তাফিজ থাকলে, বাংলাদেশের সমর্থকরা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করলে এবং বাংলাদেশে নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে। বিবিসি বাংলা ওই রিপোর্টের হুবহু বাংলা অনুবাদও প্রকাশ করেছিল।’
বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিকল্প ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলার জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন আসিফ নজরুল।
তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলার জন্য বহু চেষ্টা করেছি। কোনো কোনো দেশ থেকে সমর্থনও পেয়েছিলাম। কিন্তু সম্ভবত আইসিসির নেতৃত্বে ভারতীয়দের আধিপত্যে থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদেরকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।’
বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা, ‘ আমাদের সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বিষয় ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—দেশের মর্যাদা, আমাদের ক্রিকেটার-সাংবাদিক-সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং আগামী নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। সে সময় বলা হয়েছিল, বিশ্বকাপ না খেললে বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের নানা উদ্যোগে সেই আশঙ্কাও শেষ পর্যন্ত দূর হয়েছিল।
নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। একটি ছোট দেশ বলে কেউ আমাদের ইচ্ছেমতো অপমান করবে, আর আমরা সবসময় তা মুখ বুঝে মেনে নিবো এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। আমি সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী । মাথা নত করে সব মেনে নেয়াতে না।’
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হলেও, আসিফ নজরুল তার বক্তব্যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের দায় নিজের বলে স্বীকার করার পাশাপাশি ওই সিদ্ধান্তের পেছনে নিরাপত্তা, দেশের মর্যাদা ও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।



