অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বপ্ন বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন নয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৩ বছর। অপেক্ষার অবসান যখন হলো, তখন সেটি নিছক একটি জয় হয়ে থাকল না; বরং বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ পথচলায় এক নতুন মাইলফলক হয়ে দাঁড়াল। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। আরও তাৎপর্যের বিষয়, এই জয় এসেছে এমন এক দাপটে, যেখানে ম্যাচের সাড়ে তিন দিনের ১১টি সেশনের একটিতেও বাংলাদেশকে পেছনে পড়তে হয়নি।
টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের নিজেদের মাঠে বাংলাদেশ কী করতে পারে, ম্যাচ শুরুর আগে সেই প্রশ্নের উত্তর ছিল অনিশ্চিত। কিন্তু মাঠের ক্রিকেট সেই অনিশ্চয়তা খুব দ্রুতই দূর করে দেয়। প্রথম দিন থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে বাংলাদেশ। ব্যাট হাতে প্রয়োজনের সময় রান, বল হাতে নিয়মিত উইকেট এবং ফিল্ডিংয়ে বাড়তি উদ্যম-তিন বিভাগে সমান তালে পারফরম্যান্স করে সফরকারীরা।
শেষ দিনে অস্ট্রেলিয়ার সামনে বাংলাদেশের দেওয়া চ্যালেঞ্জ ছিল খুব বেশি বড় নয়, কিন্তু ম্যাচের পরিস্থিতি ছিল পুরোপুরি বাংলাদেশের অনুকূলে। স্বাগতিকদের ইনিংস থামে মাত্র ৫৬ রানে। ফলে জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার হয় মাত্র ৫৭ রান। সেই লক্ষ্যও খুব একটা সময় নেয়নি। ১৪.২ ওভারেই এক উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হকের ব্যাটে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
স্কোরবোর্ডে হয়তো ৯ উইকেটের জয় লেখা থাকবে, কিন্তু এই জয়ের গল্প শুধুই শেষ দিনের নয়। বরং ম্যাচের প্রতিটি ধাপেই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ তৈরি করেছে। সাড়ে তিন দিনে খেলা ১১টি সেশনের প্রতিটিই নিজেদের করে নেওয়া তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। টেস্ট ক্রিকেটে এমন ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের জয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছেন পেসাররা। অস্ট্রেলিয়ার ২০টি উইকেটের মধ্যে ১৪টিই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ নিয়ে যে সংশয় দীর্ঘদিন ধরে ছিল, ডারউইনের পারফরম্যান্স যেন তার বড় উত্তর হয়ে এসেছে। হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে পেসাররা শুধু উইকেটই নেননি, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে নিয়মিত অস্বস্তিতে রেখেছেন।
এই জায়গাটিকেই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তার মতে, কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে টেস্ট খেলার সেই আগ্রহ ছিল না, যা এখন দেখা যাচ্ছে। শান্ত বলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন (পেসারদের মানসিকতায় পরিবর্তন)। পাঁচ বছর আগেও পেসাররা টেস্ট খেলতে চাইত না। কিন্তু এখন আমরা অনেক টেস্ট ক্রিকেট খেলছি এবং তারাও টেস্ট ফরম্যাটকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা খেলতে চায়, পারফর্ম করতে চায়, বিশ্বমানের হতে চায়। এখন তাদের মানসিকতাই এমন। মুশফিকুর ও মুমিনুলের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়রাও তাদের বেশি করে টেস্ট ক্রিকেট খেলতে উৎসাহিত করেছেন।’
বাংলাদেশের এই পরিবর্তন শুধু পেসারদের পারফরম্যান্সেই সীমাবদ্ধ নয়। দলের ব্যাটাররাও নিজেদের দায়িত্ব বুঝে খেলেছেন। তানজিদ হাসান তামিম, নাজমুল হোসেন শান্ত, মেহেদী হাসান মিরাজদের পারফরম্যান্স ম্যাচের গতিপথ বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। শেষ ইনিংসে সাদমান ও মুমিনুলের দায়িত্বশীল ব্যাটিং নিশ্চিত করে কাঙ্ক্ষিত জয়।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই সাফল্য কোনো একজন ক্রিকেটারের ওপর নির্ভর করে আসেনি। দলটির প্রতিটি অংশই কোনো না কোনো সময়ে অবদান রেখেছে। তাই ম্যাচ শেষে সতীর্থদের প্রশংসা করতে গিয়ে শান্তর কণ্ঠে ছিল তৃপ্তি ও গর্ব। তিনি বলেন, ‘খুবই আনন্দিত। আমার দল ও নিজের ওপর আমি খুবই গর্বিত। আমরা যা করেছি, গর্ব করার মতোই ব্যাপার। আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি এবং শেষ পর্যন্ত জিততে পেরে অনেক খুশি।’
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় যে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে কতটা বড়, সেটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন অধিনায়ক নিজেই। শান্তর চোখে এটি শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটের সব ফরম্যাট মিলিয়ে সবচেয়ে বড় সাফল্য, ‘অবশ্যই! আমার মতে এটি যে কোনো ফরম্যাটেই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়। আমরা বিশ্বাস করি, সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও স্পেশাল কিছু করব।’
শান্তর এই মন্তব্যের পেছনে যুক্তিও আছে। দেশের বাইরে টেস্টে বাংলাদেশের সাফল্যের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়। তার ওপর প্রতিপক্ষ যখন অস্ট্রেলিয়া, তখন চ্যালেঞ্জটা আরও কঠিন। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশন, পেস সহায়ক উইকেট এবং ঘরের মাঠের অভিজ্ঞতা-সবকিছুর বিপরীতে বাংলাদেশ যেভাবে পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেটিই এই জয়কে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও এই জয়ের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ শুধু শেষ পর্যন্ত জিতেছে এমন নয়; বরং ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার পর সেই চাপ ধরে রাখার যে মানসিকতা টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ডারউইনে সেটিই দেখা গেছে বাংলাদেশের মধ্যে।
তবে ইতিহাস গড়ার পরই নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে শান্তদের। আগামী ২২ আগস্ট ম্যাকাইতে শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট। ডারউইনের জয় বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে, কিন্তু অধিনায়ক জানেন, পরের ম্যাচে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, আর বাংলাদেশ চাইবে সিরিজ শেষ করতে আরও একটি শক্তিশালী পারফরম্যান্স দিয়ে।
সেই লক্ষ্য সামনে রেখে শান্তর বার্তা খুব পরিষ্কার। -আমাদের ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে-‘আমি একই কথাই বলব। আমরা যদি সেশন ধরে ধরে খেলতে পারি, আর লোয়ার অর্ডার যদি নিয়মিত অবদান রাখতে থাকে, তাহলে এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’
ডারউইনে বাংলাদেশের জয় তাই কেবল একটি টেস্টের ফল নয়। ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের নতুন ঠিকানা তৈরি করেছে। যে দল একসময় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভালো করার স্বপ্ন দেখত, সেই দলই এবার অস্ট্রেলিয়াকে সাড়ে তিন দিনে হারিয়ে মাঠ ছেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, জয়টি এসেছে ভাগ্যের সহায়তায় নয়, ধারাবাহিক আধিপত্যে।
ডারউইনের এই বাংলাদেশ এখন তাই শুধু একটি সিরিজ জিততে চায় না। শান্তর কথায়, সামনে আরও ‘স্পেশাল কিছু’ করার বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সেই বিশ্বাস কতদূর যায়, তার পরের অধ্যায় লেখা হবে ম্যাকাইতে, শুরু ২২ আগস্ট!



