হারারে টেস্টের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল হতাশাজনক। মাত্র ১৪০ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় পড়ে সফরকারীরা। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দলের হয়ে একাই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তাইজুল ইসলাম। বাঁহাতি এই স্পিনারের দুর্দান্ত বোলিংয়ে জিম্বাবুয়ের ইনিংস বড় হতে পারেনি, আর ৭ উইকেট শিকারের অসাধারণ কীর্তিতে একের পর এক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের ব্যাটাররা যখন একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপ বাড়াচ্ছিলেন, তখন জিম্বাবুয়ে সহজেই বড় লিডের পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু এক প্রান্ত ধরে রেখে ধারাবাহিকভাবে উইকেট তুলে নেন তাইজুল। তার নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ এবং ধারালো স্পিনে স্বাগতিকদের রান তোলার গতি যেমন কমেছে, তেমনি বড় সংগ্রহের স্বপ্নও ভেঙে গেছে।
এই ইনিংসে ৭ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে দেশের বাইরে ইনিংসে সেরা বোলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছেন তাইজুল। এতদিন এই কীর্তি ছিল সাকিব আল হাসানের দখলে। ২০১৮ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩৩ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন সাকিব। হারারের পারফরম্যান্সে সেই রেকর্ড পেছনে ফেলেছেন তাইজুল।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড এখনও ইবাদত হোসেনের দখলে। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে ৪৬ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। আর জিম্বাবুয়ের মাটিতে বাংলাদেশের আগের সেরা বোলিং ছিল রবিউল ইসলামের। ২০১৩ সালে হারারেতেই ৭১ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন এই পেসার। এবার সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেলেন তাইজুল।
তাইজুলের জন্য অবশ্য ইনিংসে ৭ উইকেট নেওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২১ সালে চট্টগ্রামে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনি নিয়েছিলেন ৭ উইকেট। তারও আগে ২০১৪ সালে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩৯ রানে ৮ উইকেট নিয়ে গড়েছিলেন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা ইনিংস বোলিংয়ের রেকর্ড, যা এখনও অক্ষত রয়েছে।
হারারের এই স্পেল ছিল টেস্ট ক্যারিয়ারে তাইজুলের তৃতীয় সাত উইকেট শিকার। বাংলাদেশের আর কোনো বোলার একাধিকবার এক ইনিংসে ৭ উইকেট নিতে পারেননি। এনামুল হক জুনিয়র, সাকিব আল হাসান এবং মেহেদী হাসান মিরাজ এই কীর্তি গড়েছেন একবার করে, কিন্তু তাইজুল নিজেকে নিয়ে গেছেন আলাদা উচ্চতায়।
বিদেশের মাটিতে পাঁচ উইকেট নেওয়ার ক্ষেত্রেও এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল বোলার তিনি। এটি ছিল দেশের বাইরে তার ষষ্ঠ পাঁচ উইকেট শিকার। এর আগে এই রেকর্ড ছিল সাকিবের, যিনি ৪৫ ইনিংসে পাঁচবার এই কীর্তি গড়েছিলেন। সেখানে মাত্র ৩০ ইনিংসেই ছয়বার পাঁচ উইকেট নিয়ে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন তাইজুল।
শুধু বিদেশের রেকর্ডই নয়, বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ সংখ্যক পাঁচ উইকেট শিকারের তালিকাতেও এখন যৌথভাবে শীর্ষে উঠে এসেছেন তিনি। সাকিব আল হাসান ১২১ ইনিংসে ১৯ বার পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন। তাইজুল সেই সংখ্যায় পৌঁছেছেন মাত্র ১০৭ ইনিংসে, যা তার ধারাবাহিকতারই বড় প্রমাণ।
হারারের পারফরম্যান্স আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও তাইজুলকে নিয়ে গেছে নতুন অবস্থানে। ৭ উইকেট যোগ করে তার টেস্ট উইকেট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭০। এর মাধ্যমে টেস্ট ইতিহাসে বাঁহাতি স্পিনারদের মধ্যে পঞ্চম সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হয়েছেন তিনি। পেছনে ফেলেছেন ভারতের কিংবদন্তি বিষেন সিং বেদিকে, যার উইকেট সংখ্যা ২৬৬।
এখন তার সামনে রয়েছেন রবীন্দ্র জাদেজা, ড্যানিয়েল ভেট্টোরি এবং রঙ্গনা হেরাথের মতো কিংবদন্তি স্পিনাররা। বর্তমান গতিতে এগোতে পারলে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে ৩০০ টেস্ট উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করার সম্ভাবনাও সবচেয়ে বেশি তাইজুলেরই।









Discussion about this post