অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রাখার শুরুটা বাংলাদেশের জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের। প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল দল। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে নামা বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসে সেই ধাক্কা বড় ছাপ ফেলতেই পারত। কিন্তু মূল লড়াই শুরু হতেই গল্পটা বদলে গেল। প্রস্তুতি ম্যাচের সেই বাংলাদেশই এখন ডারউইনে স্বাগতিকদের বিপক্ষে জয়ের স্বপ্ন দেখছে।
মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সিরিজের প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে আজ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেট হারিয়ে তুলেছে ১৬১ রান। বাংলাদেশের দেওয়া ২২৯ রানের লক্ষ্যের চেয়ে এখনো ৬৭ রান দূরে তারা। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ১৯৮ রানে থামিয়ে বাংলাদেশ নিজের প্রথম ইনিংসে করেছে ৪২৬ রান। তাতেই এসেছে ২২৮ রানের বিশাল লিড।
এই সংখ্যাগুলো শুধু একটি ভালো ইনিংসের গল্প নয়; অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় ব্যাটিং প্রতিরোধের গল্পও। বাংলাদেশ ১৩৮ ওভার ব্যাট করেছে, যা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গত সাত বছরের বেশি সময়ে কোনো সফরকারী দলের দীর্ঘতম ব্যাটিংয়ের নজির। একই সঙ্গে ২২৮ রানের লিডও গত সাড়ে সাত বছরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের মাটিতে কোনো সফরকারী দলের সর্বোচ্চ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণটি দেখলে। জশ হ্যাজেলউড, নাথান লায়ন, মিচেল স্টার্ক ও প্যাট কামিন্স—চারজনের নামের পাশেই রয়েছে ৩০০-এর বেশি টেস্ট উইকেট। টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর বোলিং আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যে ধৈর্য ও দৃঢ়তার ব্যাটিং দেখিয়েছে, সেটিই এই লিডকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
এই লড়াইয়ে তানজিদ তামিম, শান্তদের পাশাপাশি বড় অবদান মেহেদী হাসান মিরাজের। বাংলাদেশের স্কোর যখন ৫ উইকেটে ৩০৬, তখন ক্রিজে আসেন তিনি। কিছুক্ষণ পর মুশফিকুর রহিমও ফিরে গেলে ৩০৮ রানে ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। তখন ম্যাচের গতিপথ আবারও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সেখানেই মিরাজের ব্যাট হয়ে ওঠে প্রতিরোধের দেয়াল।
মধ্যাহ্ন বিরতির পর আউট হওয়ার আগে ১৫৪ বলে ৬৫ রানের মূল্যবান ইনিংস খেলেন এই অলরাউন্ডার। শেষ দিকের ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে তিনি শুধু উইকেট আগলে রাখেননি, বাংলাদেশের লিডও দুইশ ছাড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সাত নম্বর বা তার নিচে ব্যাট করতে নেমে সর্বোচ্চ রানের ইনিংসের রেকর্ডও এখন মিরাজের।
ম্যাচ শেষে নিজের লড়াইয়ের মুহূর্তটি মনে করে মিরাজ বলেছেন, যখন তার রান ছিল মাত্র ২, তখনই মুশফিক আউট হয়ে যান। এরপর বোলারদের সঙ্গে নিয়েই রান করতে হয়েছে তাকে। পরিস্থিতিটাকে তাই নিজের জন্য চ্যালেঞ্জিং বলেই মনে হয়েছে তার।
তবে মিরাজের গল্পটি শুধু এই ৬৫ রানে থেমে নেই। অভিষেকের পর বাংলাদেশের হয়ে তার টেস্ট উইকেট এখন ২১৯টি। ব্যাট হাতে করেছেন ২ হাজার ২৯৬ রান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টেস্ট রান সংগ্রাহকদের তালিকায় তার অবস্থান পঞ্চম। অর্থাৎ একই সময়ে বল ও ব্যাট-দুই বিভাগেই বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার হয়ে উঠেছেন তিনি।
বিশ্ব ক্রিকেটেও এই দ্বৈত সামর্থ্যের উদাহরণ খুব বেশি নেই। অভিষেকের পর থেকে টেস্টে ২ হাজারের বেশি রান ও ২০০-এর বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তি মিরাজের সঙ্গে রয়েছে আর মাত্র একজনের—ভারতের রবীন্দ্র জাদেজার।



