ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন উত্থানের সাক্ষী মুশফিকুর রহিম। সীমিত ওভারের ক্রিকেটকে বিদায় বলে এখন শুধু টেস্টেই খেলছেন তিনি। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের বহু উত্থান-পতন দেখেছেন। এবার সেই অভিজ্ঞতার ভান্ডারে যোগ হলো বিশ্বসেরা দল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ টেস্ট দলের ঐতিহাসিক জয়। মাউন্ট মঙ্গানুই থেকে ডারউইন-লাল বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সামর্থ্যের পথচলাটা খুব কাছ থেকেই দেখেছেন মুশফিক।
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর সতীর্থদের সাফল্যে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রকাশ করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্য দিচ্ছেন মুশফিক। সেখানে দলের সাম্প্রতিক উন্নতিতে নিজের গর্বের কথা জানান তিনি।
মুশফিক বলেন, ‘বাংলাদেশের লাল বলের দলের এই পথচলা থেকে যদি কিছু সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি, সেটাই আমার জন্য অনেক বড় স্মৃতি হয়ে থাকবে। সত্যি বলতে, এই দলকে নিয়ে আমি গর্বিত।’
গত তিন থেকে পাঁচ বছরে দলের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে খেলোয়াড়দের নিজেদের আরও উন্নত করার তাড়নাকেই দেখছেন মুশফিক। তিনি বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যে নিজেদের আরও ভালো করার তাড়না তৈরি হয়েছে। এই মানসিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন খেলোয়াড় যদি নিজের পারফরম্যান্সে মাত্র দুই শতাংশও উন্নতি করতে পারে, তার প্রভাব কিন্তু শুধু ব্যক্তিগত জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো দলই তার সুফল পায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমন জয়ও আসলে সেই সম্মিলিত উন্নতিরই ফল।’
বর্তমান দলের গভীরতাও মুশফিককে আশাবাদী করছে। অতীতে ব্যক্তিগত সামর্থ্যের ওপর খেলোয়াড়দের বিশ্বাস থাকলেও পুরো দলের ওপর একই মাত্রার আস্থা সবসময় ছিল না বলে মনে করেন তিনি। এখন সেই জায়গায় বড় পরিবর্তন দেখছেন এই অভিজ্ঞ ব্যাটার।
মুশফিক জানান, ‘১০, ১৫ কিংবা ২০ বছর আগে হয়তো খেলোয়াড়দের নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস ছিল, কিন্তু পুরো দলের ওপর একই রকম আস্থা সবসময় দেখা যেত না। এখনকার ১৫-১৬ জনের স্কোয়াডে আমি ৮-৯ জনকে দেখতে পাই, যারা একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। একজন অধিনায়কের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে!’
তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়কে শুধু উদযাপনের উপলক্ষ হিসেবে দেখছেন না মুশফিক। তার মতে, বড় দলকে হারানোর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। সতীর্থদের তাই জয় উদযাপনের পাশাপাশি পরবর্তী চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
উদযাপনের পাশাপাশি ধারাবাহিকতার বার্তা দিয়ে এই কিংবদন্তি বলেন, ‘আমরা এর আগেও বড় ম্যাচ জিতেছি। কিন্তু সাফল্য ধরে রাখা এবং নিয়মিত এমন পারফরম্যান্স করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উন্নতির কোনো শেষ নেই- সীমা আসলে আকাশ পর্যন্ত। তাই এই জয় উদযাপন করো, আনন্দ করো; কিন্তু এরপরই ভাবতে হবে, কীভাবে আবারও এমন পারফরম্যান্স করা যায়।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটে কঠোর পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত মুশফিক। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পরিশ্রমের যে গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন, সেটিই এবার তরুণ সতীর্থদের মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। তার মতে, সাফল্যের পথে কোনো সহজ রাস্তা নেই; প্রতিদিন প্রক্রিয়ার প্রতি অটুট থাকা এবং একইভাবে পরিশ্রম করে যাওয়াই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ।
মুশফিক বলেন, ‘এর জন্য কোনো শর্টকাট নেই। পরিশ্রম করতেই হবে, প্রতিদিন একইভাবে লেগে থাকতে হবে। প্রক্রিয়া ঠিক থাকলে ফলাফল একসময় নিজে থেকেই আসবে।’
সবশেষে খেলোয়াড়দের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন মুশফিক। ম্যাচের ফল কিংবা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বাইরে একজন ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টি হওয়া উচিত, দিনের শেষে নিজের কাছে সৎ থাকা।
মুশফিক আরও বলেন, ‘দিন শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেন প্রত্যেকে নিজেকে বলতে পারে- আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়েছি।’ বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে মুশফিকের এই বার্তায় তাই যেমন আছে অস্ট্রেলিয়া জয়ের গর্ব, তেমনি আছে সামনে আরও বড় হওয়ার তাগিদ।



