দ্বিপাক্ষিক সিরিজের হিসাবটা সরল-সামনে একজন প্রতিপক্ষ, তাকে ঘিরেই পরিকল্পনা। কিন্তু একাধিক দলের সমাগমে সেই হিসাব বদলে যায়। প্রতিপক্ষ কে হবে, কখন হবে, কোন দলের বিপক্ষে কীভাবে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। সবকিছুতেই থাকে বাড়তি অনিশ্চয়তা। বিশ্বকাপ কিংবা এশিয়া কাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট ছাড়া দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেটের ব্যস্ততায় এমন অভিজ্ঞতা এখন খুব একটা মেলে না। এশিয়ান গেমসে গিয়ে সেই আবহটাই যেন আবার ফিরে পাচ্ছে বাংলাদেশ।
এশিয়ান গেমসে উড়াল দেওয়ার আগে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক লিটন দাসের কথাতেও উঠে এসেছে সেই অনুভূতি। তার কাছে এবারের এশিয়াডের ক্রিকেটটা অনেকটাই বড় টুর্নামেন্টের মতো। লিটন বলেন, ‘যেকোনো টুর্নামেন্টে প্র্যাকটিসের চেয়েও বড় জিনিস কে আমার প্রতিপক্ষ হবে। এই ইভেন্ট এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপের মতো অনুভূতি দিচ্ছে।’
এশিয়ান গেমসে পুরুষ ক্রিকেটে বাংলাদেশকে অবশ্য গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে আসতে হচ্ছে না। র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা সরাসরি জায়গা করে নিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে। ফলে টাইগারদের প্রথম ম্যাচেই সামনে আসবে অন্য গ্রুপের একটি দল। ‘এ’ গ্রুপে আছে আফগানিস্তান, জাপান ও নেপাল; ‘বি’ গ্রুপে হংকং, মালয়েশিয়া ও ওমান। দুই গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল যোগ দেবে সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা পাওয়া চার দলের সঙ্গে।
এই অচেনা সমীকরণই হয়তো লিটনের কাছে টুর্নামেন্টের আলাদা আকর্ষণ। তবে প্রতিপক্ষ নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনার চেয়ে নিজেদের প্রস্তুতিকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘কার সাথে কার খেলা হবে জানেন না। আমরা সব দলের জন্যই প্রস্তুত। নিজেদের যতটা প্রস্তুতি নেওয়া দরকার সেটা করেছি। বেশিরভাগ দলের সাথেই আমাদের খেলার অভিজ্ঞতা আছে। চেষ্টা করব ঐ অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর।’
টি-টোয়েন্টি দলটাও দীর্ঘ সময় পর একসঙ্গে হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচিতে এ বছর ওয়ানডে ও টেস্টের সংখ্যাই ছিল বেশি। টি-টোয়েন্টির সুযোগ কম থাকলেও ক্রিকেটারদের অনেকেই ব্যস্ত ছিলেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে। এশিয়ান গেমসের আগে ক্যাম্প ও প্রস্তুতি ম্যাচ তাই শুধু মাঠের প্রস্তুতিই নয়, দলীয় বোঝাপড়ার জায়গাটাও তৈরি করেছে বলে মনে করেন লিটন।
‘খেলোয়াড়রা খেলার মধ্যেই আছে। এই বছর তো ওয়ানডে ও টেস্ট বেশি। টি-টোয়েন্টি কম খেলেছে। তবে অনেকেই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলে বেড়াচ্ছে। আমাদের সুযোগই কম ছিল একসাথে হওয়ার। এই ক্যাম্প ও প্র্যাকটিস ম্যাচ বন্ডিংয়ে সহায়তা করেছে। বিশ্বকাপে চেষ্টা করব ভালো কিছু করার। ভালো খেলা ছাড়া তো উপায় নেই, এটাই মূল লক্ষ্য।’
এশিয়ান গেমস অবশ্য শুধু ক্রিকেটের গল্প নয়। একই আসরে একসঙ্গে লড়াই করেন নানা ডিসিপ্লিনের ক্রীড়াবিদরা। ক্রিকেটের ব্যস্ততার ফাঁকে সুযোগ পেলে অন্য খেলার প্রতিযোগিতা দেখার আগ্রহও আছে লিটনের। বিকেএসপির ছাত্র থাকার সময় থেকেই বিভিন্ন খেলা দেখার অভিজ্ঞতা তার। এবারও সুযোগ পেলে অন্য ক্রীড়াবিদদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ নিতে চান তিনি।
‘জানি না ঐ সুযোগ পাব কি না। যেহেতু বিকেএসপির ছাত্র ছিলাম, ক্রিকেটের সাথে অনেক স্পোর্টস দেখার সুযোগ ছিল। যদি ওরকম সুযোগ পাই, তাড়া না থাকে, অন্য খেলা দেখব। অন্য স্পোর্টস দেখলে শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। অনেক দেশের মানুষ ওখানে আছে। যেকোনো স্পোর্টসম্যানের সাথে কথা বলতে পারবেন। অনেক কিছু শেখার সুযোগ থাকবে।’
তবে এশিয়ান গেমসের ক্রিকেট যখন অলিম্পিকের সম্ভাব্য ভবিষ্যতের সঙ্গে একই আলোচনায় আসে, তখন সামনে চলে আসে ফরম্যাটের প্রশ্নও। দ্রুত শেষ হওয়া, কম সময়ে ফল পাওয়া এবং দর্শকদের জন্য চার-ছক্কার বাড়তি বিনোদন-সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টিই এখন বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরের জন্য সুবিধাজনক ফরম্যাট বলে মনে করেন লিটন।
টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ পরিসরকে অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসের মতো আসরের সঙ্গে মেলানো কঠিন বলেই মনে করেন তিনি। ক্রিকেটের একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচই যেখানে কয়েক ঘণ্টা সময় নেয়, সেখানে টেস্ট আয়োজনের ব্যাপ্তি আরও অনেক বড়, ‘ভবিষ্যতে যদি প্রয়োজন মনে করে ওয়ানডে বা টেস্ট ফরম্যাট আনতে পারে। একটা টুর্নামেন্ট চালালে মাথায় রাখতে হবে এটা কত লম্বা হচ্ছে। যেকোনো স্পোর্টস ১০ মিনিটে শেষ হয়ে যায়। ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই ৪ ঘণ্টা চলে যায়। সেখানে যদি টেস্ট হয়, চিন্তা করেন কত সময় লাগবে!’
অন্য খেলাগুলোর মধ্যে অ্যাথলেটিকস ও সাঁতারের প্রতি লিটনের আগ্রহের কথাও জানা গেল। বিশেষ করে বিশ্বের দ্রুততম মানবদের দৌড় তাকে টানত। ‘খুব একটা দেখা হয় না, তবে সুইমিং বা অ্যাথলেটিক দেখতাম। উসাইন বোল্ট। এগুলো দেখতে মজা লাগত। ক্রিকেট কে দেখবে? যেকোনো ইভেনে শর্ট অ্যান্ড শার্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে। বোল্ট তো বড় নাম ছিল, তাকে দেখতাম।’
এবার অবশ্য অন্য খেলাগুলো দেখার চেয়ে লিটনের নিজের দলের লড়াইটাই বড় হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল ২৯ সেপ্টেম্বর, ‘বি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে। জয় পেলে ১ অক্টোবর সেমিফাইনাল, এরপর ৩ অক্টোবর ফাইনাল। সব ম্যাচই হবে নিসিনের কোরোগি স্পোর্টস পার্কে।



