শেষবার যখন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে ঢুকলেন লিওনেল মেসি, তখন মনুমেন্তালে কোনো শব্দই যেন যথেষ্ট ছিল না। হাজারো মানুষ দাঁড়িয়ে, কারও চোখে পানি, কারও কণ্ঠে ‘মেসি’ নামের উচ্চারণ। মাঠের ভেতরে তখন একজন ৩৯ বছর বয়সী ফুটবলার, আর মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল তার দুই দশকের বেশি সময়ের স্মৃতি। যে ছেলেটি একদিন রোজারিও থেকে স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়েছিলেন, সেই ছেলেটিই এদিন আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবারের মতো বল ছুঁলেন। বিদায়ের রাতটাকে আরও বিশেষ করে তুললেন গোল ও অ্যাসিস্টে। যেন নিজের গল্পের শেষ দৃশ্যটিও মেসি নিজেই লিখে গেলেন।
এই বিদায় ছিল কেবল একজন ফুটবলারের বিদায় নয়। মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক যে কতটা গভীর, মনুমেন্তালের আবেগঘন পরিবেশ তারই সাক্ষ্য দিয়েছে। গ্যালারিতে শিশু থেকে বৃদ্ধ-সবাই কাঁদছিলেন। কারণ বহু মানুষের কাছে আর্জেন্টিনা মানেই মেসি। কেউ তাকে দেখেছেন শৈশব থেকে, কেউ আবার জন্মের পর থেকেই জাতীয় দলের জার্সিতে তাকে দেখে বড় হয়েছেন।
একটি দেশে রাজনৈতিক মত, সামাজিক বিভাজন কিংবা ফুটবল নিয়ে নানা মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু মেসির বিদায়ের দিনে যেন সেসব কিছুক্ষণের জন্য থেমে গিয়েছিল। আর্জেন্টিনার মানুষের আবেগ এক জায়গায় এসে মিলেছিল। দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার, সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী তারকাই জাতীয় দলকে বিদায় জানাচ্ছেন-এই উপলব্ধি পুরো রাতটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল।
মেসিও যে প্রস্তুত ছিলেন না এই আবেগ সামলানোর জন্য, তার প্রমাণ মিলেছিল স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর আগেই। বাসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন তিনি। জাতীয় দলের জার্সিতে কাটানো দুই দশকেরও বেশি সময় যেন একের পর এক দৃশ্য হয়ে ফিরে আসছিল তার চোখের সামনে।
মনুমেন্তালে পৌঁছে আবেগ আরও ঘনীভূত হয়। সাজানো ড্রেসিংরুম, চারপাশে স্মৃতির আবহ-সবকিছুতেই যেন ছিল বিদায়ের ছাপ। মাঠে নামার আগে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরো ভিআইপি বক্সে আছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করে নিয়েছিলেন মেসি।
ওয়ার্মআপের জন্য মাঠে নামতেই গ্যালারি উঠে দাঁড়ায়। মেসি হাত তুলে দর্শকদের অভিবাদন জানান। কিন্তু আবেগকে আর পুরোপুরি আটকে রাখতে পারেননি। চোখের পানি মুছতে মুছতে চারপাশের দর্শকদের দিকে তাকিয়েছেন তিনি। মাঠে প্রবেশের সময় তিন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন। জাতীয় সংগীত বাজছিল, কিন্তু এবার তাঁর কণ্ঠে ছিল না সেই পরিচিত সুর। আবেগ যেন গলায় আটকে ছিল।
সেই মুহূর্তে হয়তো ফিরে এসেছিল ছোট্ট লিওর দিনগুলো। মনে পড়েছিল দাদি সেলিয়া অলিভেইরার কথা। ছোটবেলায় যিনি হাত ধরে মাঠে নিয়ে যেতেন তাকে। গ্রান্দোলি ক্লাবের মাঠে কিংবা রোজারিওর রাস্তায় বল নিয়ে ছুটে বেড়ানো সেই শিশুটিই একদিন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে উঠবেন-তখন তা জানার উপায় ছিল না কারও।
মেসির ফুটবল-জীবনের শুরুর গল্পে সেলিয়ার উপস্থিতি তাই আলাদা। সাম্প্রতিক অ্যালবাম ‘লাস্ট ড্যান্স’ও তিনি উৎসর্গ করেছেন দাদি সেলিয়া ও বাবা হোর্হেকে। তার ফুটবলের প্রতি যে গভীর টান, তার শিকড়ও যেন সেই শৈশবের দিনগুলোতে।
বিদায়ী ম্যাচের আনুষ্ঠানিকতাও নিজের মতো করেই পালন করেছেন মেসি। টসের পর বেনিনের অধিনায়কের হাতে তুলে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকা। বিনিময়ে পেয়েছেন বিশেষ একটি উপহার। সতীর্থদের প্রত্যেককে আলিঙ্গন করেছেন। এরপর শুরু হয়েছে সেই ম্যাচ, যা ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বহন করছিল।
শুরুর দিকে মেসি কিংবা আর্জেন্টিনা-কেউই নিজেদের ছন্দে ছিলেন না। বেনিনের খেলোয়াড়েরা বারবার মেসির কাছে এসে তাকে আলিঙ্গন করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলেন। এমনকি ম্যাচের শুরুতে কয়েক মিনিটের জন্য খেলার গতিও যেন সেই আবেগের কাছে থমকে গিয়েছিল।
কিন্তু মেসি এসেছিলেন খেলতে। শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের কাজটুকু করে যেতে। দ্বিতীয়ার্ধে সেই পরিচিত মেসিকেই দেখা গেল। নিকোলাস ওতামেন্দির গোলের আগে তার অ্যাসিস্টে এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। এরপর নিকো পাজকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দিলেন তার পরিচিত নিখুঁত স্পর্শে। আর শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি থেকে নিজেই করলেন গোল।
বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জয় দিয়ে শেষ হলো মেসির বিদায়ী ম্যাচ। গোলের পর সতীর্থরা তাকে ঘিরে দাঁড়ালেন। মেসির মুখে তখন হাসি। যেন জন্মদিনের কেকের চারপাশে দাঁড়িয়ে সবাই উদ্যাপন করছে সেই মানুষটিকে, যার সঙ্গে তারা বছরের পর বছর পথ চলেছে।
জাতীয় দলের জার্সিতে এটি ছিল মেসির ১২৬তম গোল। সেই গোলটিকেও অনেকে দেখেছেন দাদি সেলিয়ার জন্য আরেকটি উপহার হিসেবে।
মেসির গল্পের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ একটি স্বপ্ন দিয়ে-তিনি শুধু ফুটবল খেলতে চেয়েছিলেন। আজ তার তিন ছেলেও বল দেখলেই ছুটে যায়। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের রাতেও উৎসবের মধ্যে তিন ছেলেকে বল নিয়ে ছুটতে দেখা গিয়েছিল। দৃশ্যটি যেন ফিরিয়ে এনেছিল বহু বছর আগের সেই ছোট্ট লিওকে, যিনি ভাইদের সঙ্গে রাস্তায় কিংবা গ্রান্দোলির মাঠে বল নিয়ে ছুটতেন।
কিন্তু সেই ছোট্ট ছেলেটির পথ কখনোই সহজ ছিল না। রোজারিওর কোচেরা তার প্রতিভা নিয়ে মুগ্ধ হলেও গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি তার ফুটবলজীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। চিকিৎসার ব্যয়, শৈশবের শহর ছেড়ে অচেনা দেশে পাড়ি দেওয়া এবং বার্সেলোনায় নতুন জীবন শুরু করা-সবকিছুর মধ্যেও তার স্বপ্ন ছিল একটাই, একদিন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা।
জাতীয় দলের প্রতি সেই টানই তাকে স্পেনের হয়ে খেলার সম্ভাবনাও প্রত্যাখ্যান করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে জাতীয় দলের গল্পে সাফল্যের পাশাপাশি ছিল অসংখ্য ব্যর্থতা ও যন্ত্রণা।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়-সবকিছু মেসির ওপর প্রবল চাপ তৈরি করেছিল। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছিলেন তিনি। সমালোচনার তীব্রতাও তখন ছিল চরমে।
কিন্তু সেই বিদায় স্থায়ী হয়নি। মেসি ফিরে এসেছিলেন। এবং এরপর তার জাতীয় দলের গল্প যেন নতুন করে লেখা হয়।
২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। পরের বছর কাতার বিশ্বকাপ সেই গল্পকে পূর্ণতা দেয়।
৩৫ বছর বয়সী মেসি কাতারে শুধু দলের অধিনায়ক ছিলেন না, ছিলেন পুরো আর্জেন্টিনার আশার কেন্দ্রবিন্দু। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হারের পর যখন দল চাপে পড়ে যায়, তখন শুরু হয় অন্য এক মেসির গল্প। মেক্সিকোর বিপক্ষে দূরপাল্লার গোল, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অসাধারণ পাস, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ড্রিবল-একটির পর একটি মুহূর্তে তিনি দলকে এগিয়ে নিয়েছেন।
ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচটি হয়ে ওঠে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় লড়াই। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত হওয়ার পর সবুজ ঘাসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন মেসি। তারপর আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ঐতিহ্যবাহী কালো বিশত গায়ে জড়িয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন তিনি।
যে ট্রফির জন্য এত বছর অপেক্ষা, সেটি শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে উঠেছিল। শৈশব থেকে যে স্বপ্ন নিয়ে পথচলা, তার সবচেয়ে বড় অধ্যায়টি সেদিন সম্পূর্ণ হয়েছিল।
মেসির জাতীয় দলের ক্যারিয়ার শুধু গোল আর ট্রফির পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা কঠিন। ২১ বছরের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়া, ব্যর্থতার পর বারবার ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত দলকে সর্বোচ্চ সাফল্যের জায়গায় পৌঁছে দেওয়া-এই ধারাবাহিকতাই তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় পরিচয়।
জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ২০৮ ম্যাচ, সর্বোচ্চ ১২৬ গোল এবং ৭০ অ্যাসিস্ট তার পরিসংখ্যানের অংশ। বিশ্বকাপেও রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৩৪ ম্যাচ, গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩৩ অবদান, ১৪০ শট, ৬৪ শট অন টার্গেট, ৯৯টি সুযোগ তৈরি এবং ২৫০টি সফল ড্রিবল-সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেসির উপস্থিতি নিজেই একটি আলাদা অধ্যায়।
তবে এই সংখ্যাগুলোর বাইরেও রয়েছে মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক। একসময় যে তরুণকে নিজের দেশের মানুষ ‘পরবাসী’ বলে সমালোচনা করেছিলেন, সেই মানুষটিই পরে হয়ে উঠেছেন নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের আদর্শ। রদ্রিগো দি পল, নিকোলাস ওতামেন্দি, লো সেলসো, আনহেল দি মারিয়া, লিয়ান্দ্রো পারেদেসদের সতীর্থ থেকে শুরু করে এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজদের অনুপ্রেরণা-মেসির প্রভাব ছড়িয়ে আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে!



