একটি জার্সি কখনো কেবল জার্সি থাকে না। কখনো তা দলের পরিচয়, কখনো পতাকার রং, কখনো সমর্থকের আবেগ। আর কখনো একটি দেশের গল্পও শরীরে তুলে নেয়।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নতুন জার্সিতে এবার সেই গল্পটি লেখা হয়েছে অক্ষরে অক্ষরে। বাংলা বর্ণমালা এসেছে কাপড়ের জমিনে, কখনো জলছাপের মতো, কখনো এমবসড টেক্সচারে। মাঠে যে দলটি বাংলাদেশের নাম বহন করবে, তার পোশাকেও তাই এবার দৃশ্যমান বাংলাদেশের আরেক পরিচয়-বাংলা।
মঙ্গলবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মিলনায়তনে উন্মোচিত হলো জাতীয় ফুটবল দলের নতুন হোম ও অ্যাওয়ে কিট। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়ালের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নতুন জার্সির সঙ্গে পরিচিত হলো ফুটবল-সমর্থকেরাও। দেশীয় ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘দৌড়’ তৈরি করেছে এই কিট।
হোম জার্সির গল্প শুরু সাদা দিয়ে। শুভ্র জমিনের কলার ও দুই পাশে লালের ছোঁয়া। দূর থেকে সরল; কাছে গেলে বোঝা যায়, এই সরলতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে নকশার মূল ভাষা। কাপড়ের ওপর ওয়াটারমার্কে ফুটে উঠেছে বাংলা বর্ণমালার অবয়ব। বুকের এক পাশে বাফুফের লোগো, আর লাল অক্ষরে জার্সি নম্বর। সঙ্গে লাল শর্টস, সাদা মোজা।
অ্যাওয়ে জার্সি আরও পরিচিত এক বাংলাদেশকে সামনে আনে। সবুজের ওপর লাল। কাঁধে লালের স্ট্রাইপ, সামনের অংশে এমবসড টেক্সচারে বাংলা বর্ণ ও হরফ। নম্বর আর প্রস্তুতকারকের লোগো সাদা। সবুজ শর্টস, সবুজ মোজা-পুরো কিটে যেন জাতীয় পতাকার দুই রং নিজেদের মতো করে জায়গা করে নিয়েছে।
কিন্তু এই নকশার সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজারের হিসাবও। নতুন অফিসিয়াল জার্সির দাম ১ হাজার ৬০০ টাকা। খেলোয়াড়ের নাম ও নম্বর যুক্ত সংস্করণ কিনতে লাগবে ১ হাজার ৭০০ টাকা। সাধারণ সমর্থকদের জন্য রাখা হয়েছে ফ্যান এডিশন, যার দাম ৭০০ টাকা। এই দামও ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা বাড়তে পারে।
দাম কেন আগের চেয়ে বেশি-তার ব্যাখ্যাও এসেছে প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে। ‘দৌড়’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আবিদ আলম বলছেন, এবার জার্সির কাপড়ের মান উন্নত করা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে উৎপাদন, বিপণন ও দেশের নানা প্রান্তে সরবরাহের খরচ। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দাম এখনো প্রতিযোগিতামূলক; এমনকি তাঁর জানা মতে বাংলাদেশের নতুন জার্সিই বিশ্বের সবচেয়ে কম দামের জাতীয় দলের জার্সি।
জার্সির গায়ে অবশ্য শুধু সমর্থকের আবেগের হিসাব নেই, আছে ফেডারেশনেরও হিসাব। বিক্রি থেকে নির্দিষ্ট অংশ রয়্যালটি হিসেবে পাবে বাফুফে। কত শতাংশ বা কত টাকা-সেটি প্রকাশ করা হয়নি।
তবে জার্সি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাপক বাজারে না এলেও তার জন্য আগ্রহ তৈরি হয়েছে। রবি ও বাংলালিংকের মতো করপোরেট প্রতিষ্ঠান আগেই অর্ডার করেছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ জার্সি। আশ্চর্যের বিষয়, কিছু প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত নকশা দেখার আগেই অর্ডার দিয়ে ফেলেছিল।
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার জার্সি বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবিদ আলম। সংখ্যাটি আনুমানিক; সুনির্দিষ্ট হিসাব তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে লক্ষ্যটি নির্দিষ্ট-ডিসেম্বরের মধ্যে ১ লাখ জার্সি বিক্রি করতে চায় ‘দৌড়’।
সামনে বাংলাদেশের ফুটবলের ব্যস্ত সময়। ফিফা এশিয়ান কাপ ও সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের মতো প্রতিযোগিতা ঘিরে সমর্থকদের আগ্রহ বাড়বে, আর সেই আগ্রহের সঙ্গে জার্সির বাজারও বড় হবে-এমন প্রত্যাশা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের।
পরিকল্পনাটিও তাই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে। অনলাইনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ফিজিক্যাল আউটলেটে পাওয়া যাবে জার্সি। সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আমেরিকার বাজারে এটি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। এমনকি ফিফা মিউজিয়ামের দোকানেও বাংলাদেশের নতুন জার্সি রাখার স্বপ্ন দেখছে ‘দৌড়’।
তবু গল্পের একটি অধ্যায় এখনো বাকি। হোম ও অ্যাওয়ে কিট সামনে এলেও তৃতীয় জার্সি এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়। এর নকশা জমা পড়েছে, প্রস্তাব করা হয়েছে একাধিক রং। সব ঠিক থাকলে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পর সেই জার্সিও দেখা যেতে পারে।
নতুন কিটটি অবশ্য আরও আগেই দেখা যাওয়ার কথা ছিল। গত জুনেই জার্সি উন্মোচনের জন্য প্রস্তুত ছিল ‘দৌড়’। কিন্তু ভিআইপি অতিথিদের সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে বারবার পিছিয়েছে অনুষ্ঠান। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার খুলেছে অপেক্ষার পর্দা।
তারপর থেকে জার্সিটি আর শুধু কাপড়ের নকশা নয়। এর প্রতিটি অক্ষর যেন মাঠের বাইরে থাকা একটি গল্পকে মাঠের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। যে ভাষায় মানুষ কথা বলে, যে বর্ণমালায় নিজের নাম লেখে, সেই বর্ণমালাই এবার ছাপ পড়েছে জাতীয় দলের পোশাকে।



