হার মানেই সিরিজ শেষ। এমন সমীকরণ নিয়েই বুলাওয়ের কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে পরাজয়ের পর দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ছিল বাঁচা-মরার লড়াই। সেই চাপের ম্যাচেই দেখা মিলল এক ভিন্ন বাংলাদেশের। যেখানে ছিল দুর্দান্ত শুরু, মাঝপথে ভয়ংকর ধস, শেষ দিকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন এবং সবশেষে নিয়ন্ত্রিত বোলিং। আজ নাটকীয় সব বাঁক পেরিয়ে ৩৪ রানের জয় তুলে নিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ১-১ সমতা ফেরাল টাইগাররা।
বাংলাদেশের ইনিংস যেন দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে ছিলেন দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম, আর দ্বিতীয় ভাগে ইয়াসির আলী ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। মাঝখানে যা ঘটেছে, সেটি যেন এক দুঃস্বপ্ন।
টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরু থেকেই জিম্বাবুয়ের বোলারদের ওপর চড়াও হন দুই ওপেনার। পাওয়ারপ্লেতে বিনা উইকেটে ৫৪ রান তুলে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দেয়, প্রথম ম্যাচের ব্যর্থতা পেছনে ফেলেই তারা খেলতে নেমেছে। তানজিদ ছিলেন স্বভাবসুলভ আগ্রাসী, আর সাইফ খেলেছেন পরিণত ইনিংস। দুজনই তুলে নেন অর্ধশতক, আর তাদের ১২০ রানের উদ্বোধনী জুটি ম্যাচের ভিত্তি গড়ে দেয়।
কিন্তু ক্রিকেট যে মুহূর্তেই চিত্রনাট্য বদলে দিতে পারে, সেটিই দেখা গেল এরপর। ১২০ রানে প্রথম উইকেট হারানোর পর আচমকাই ছন্দ হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। মাত্র ২১ রান যোগ করতেই ফিরে যান আরও চার ব্যাটার। ১৩ বলের মধ্যে পাঁচ উইকেট হারিয়ে সম্ভাব্য দুই শতাধিক রানের স্কোর মুহূর্তেই অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়, পারভেজ ইমন ও নুরুল হাসান-কেউই ইনিংসকে এগিয়ে নিতে পারেননি।
ঠিক তখনই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন ইয়াসির আলী ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। শেষ ১৯ বলে তাদের অবিচ্ছিন্ন ৪৫ রানের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসে নতুন প্রাণ ফেরায়। বিশেষ করে শেষ ওভারে সাইফউদ্দিনের ব্যাট থেকে আসে চারটি চার-ছক্কায় ২৮ রান। মাত্র ১০ বলে ৩১ রানের বিধ্বংসী ইনিংসে তিনি জিম্বাবুয়ের হাত থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কেড়ে নেন। ইয়াসিরও ১২ বলে ২২ রানের কার্যকর ইনিংস খেলেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৬ রানের সংগ্রহ দাঁড় করায় বাংলাদেশ, যা মাঝের ধস বিবেচনায় প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।
তবে ব্যাটিংয়ের মতোই বোলিংয়েও বাংলাদেশকে শুরুতেই পরীক্ষা দিতে হয়েছে। প্রথম ওভারেই ১৫ রান তুলে জিম্বাবুয়ে দ্রুত জবাব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু ওভারের শেষ বলেই শেখ মেহেদী হাসান প্রথম আঘাত করেন। পরের ওভারে নাহিদ রানার গতিতে ফেরেন ব্রায়ান বেনেট। এরপর আবার মেহেদীর আঘাতে ডিয়ন মেয়ার্সও বিদায় নিলে মাত্র তিন ওভারের মধ্যেই ম্যাচে শক্ত অবস্থান তৈরি করে বাংলাদেশ।
তবু জিম্বাবুয়ে সহজে হার মানেনি। অধিনায়ক সিকান্দার রাজা এবং মিল্টন শুম্বা পাল্টা লড়াইয়ের চেষ্টা করেন। বিশেষ করে রাজা মাত্র ১২ বলে ২৮ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেই ম্যাচের উত্তাপ বাড়িয়ে দেন। কিন্তু সেই আগুন বেশিক্ষণ জ্বলতে দেননি বাংলাদেশের বোলাররা। পাওয়ারপ্লের পরপরই রাজাকে ফিরিয়ে দিয়ে আবার ম্যাচের লাগাম নিজেদের হাতে নেয় সফরকারীরা।
এরপর রায়ান বার্ল ১৯ বলে ২৯ এবং ব্র্যাড ইভান্স ১৪ বলে ২৫ রান করে শেষ চেষ্টা চালালেও প্রয়োজনীয় রানরেট ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যায়। শেষ দুই ওভারে যখন ৪০ রান প্রয়োজন, তখন সাইফউদ্দিনের দুর্দান্ত ওভারে আসে মাত্র ২ রান এবং উইকেট। শেষ ওভারে ৩৮ রানের অসম্ভব সমীকরণ নিয়ে নামা জিম্বাবুয়ে শেষ পর্যন্ত ১৫২ রানে অলআউট হয়।
বল হাতে বাংলাদেশের নায়ক ছিলেন রিশাদ হোসেন। চার উইকেট নিয়ে জিম্বাবুয়ের শেষ প্রতিরোধও গুঁড়িয়ে দেন এই লেগ স্পিনার। শেখ মেহেদী হাসান তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে পাওয়ারপ্লেতেই ম্যাচ বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেন। নাহিদ রানা ও সাইফউদ্দিনও নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।
এই জয়ে শুধু সিরিজে সমতা ফেরেনি, ফিরেছে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসও। প্রথম ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে চাপের মুহূর্তে যেভাবে দলটি নিজেদের সামলে নিয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ওপেনারদের দারুণ সূচনা, মাঝের ধস থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্স-সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ দলীয় প্রচেষ্টা।
এখন সব হিসাব এসে ঠেকেছে ১৯ জুলাইয়ের তৃতীয় ও শেষ টি-টোয়েন্টিতে।










Discussion about this post