অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৯ উইকেটের জয়-বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এমন একটি মুহূর্ত, যার রেশ সহজে কাটার নয়। ডারউইনে জয়ের পর মাঠের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে ড্রেসিংরুম থেকে বিসিবি পর্যন্ত। কিন্তু এই জয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো স্কোরবোর্ডে নয়, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে। হঠাৎ করেই ফাইনালের দৌড়ে বাংলাদেশের নামটা আরও জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসন এখনই সেই স্বপ্নে বিভোর হতে চায় না। কারণ, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল এক ম্যাচের ফল দিয়ে নিশ্চিত হয় না; দুই বছরের দীর্ঘ চক্রে ধারাবাহিক সাফল্যই শেষ পর্যন্ত দুই ফাইনালিস্ট নির্ধারণ করে। ডারউইনের জয়ের পর বাংলাদেশ ৬৬.৬৭ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে টেবিলের চারে। শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার সফলতার হার ৭৭.৭৮ শতাংশ। দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডও বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে।
তবু বাংলাদেশের অবস্থানকে একেবারে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে জয় এলে বাংলাদেশের সফলতার হার উঠে যাবে ৭২.২২ শতাংশে। তখন ফাইনালের দৌড় আরও জমে উঠবে। এরপরও বাংলাদেশের হাতে থাকবে ছয়টি টেস্ট-চারটি দেশের মাটিতে, দুটি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাদের মাটিতে।
হিসাবের দরজা খোলা। কিন্তু সেই দরজার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে চায় না বাংলাদেশ।
বিসিবির ক্রিকেট অপারেশনসের ইনচার্জ শাহরিয়ার নাফীসের কথায় সেটিই স্পষ্ট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের জটিলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ একটা জটিল সমীকরণ। দুই বছরের টুর্নামেন্টে কেবল দুইটা দল ফাইনাল খেলে। বাস্তবিক ও সমীকরণগত দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক ওপরে। এখন যে সমীকরণটা আছে, যেকোনো দলের জন্য অনেকগুলো দলেরই দারুণ সম্ভাবনা আছে। আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট বা অধিনায়ক এটা খুব স্পষ্টভাবে বলেছে যে আমরা ম্যাচ বাই ম্যাচ জিততে চাই।’
এই ‘ম্যাচ বাই ম্যাচ’ ভাবনাটাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। কারণ ফাইনালে যাওয়ার হিসাব করতে গিয়ে একটি দল যখন ভবিষ্যতের অনেক দূরে তাকায়, তখন সামনে থাকা ম্যাচটির গুরুত্ব কখনো কখনো আড়ালে পড়ে যায়। বাংলাদেশ বরং প্রতিটি টেস্টকে আলাদা করে দেখছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের পরও দ্বিতীয় টেস্টের আগে তাই কোনো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জায়গা তৈরি করতে চায় না তারা।
নাফীসও একই কথা বলছেন। ‘এরপরে আরও আমাদের সাতটা টেস্ট ম্যাচ বাকি আছে। এখন এটা নিয়ে তাই চিন্তা না করে, আমাদের সামনে যে বর্তমানে যে টেস্ট ম্যাচটা আছে, ম্যাচ ধরে যদি যদি এগোনো যায়, সমীকরণের জায়গা, গাণিতিক সমীকরণ জানি যখন মেলার, সেটা তখন মিলেই যাবে।’
বাংলাদেশের সামনে থাকা সাত টেস্টের গল্পটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ম্যাকেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের পর ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি করে ম্যাচ খেলবে শান্তর দল। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজ। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পরও সামনে এমন কয়েকটি সিরিজ রয়েছে, যেগুলোর ফল বাংলাদেশের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অবস্থান আমূল বদলে দিতে পারে।
ডারউইনের জয় অবশ্য দলের মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন করেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর ক্রিকেটারদের উদযাপনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মাঠে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির পর ড্রেসিংরুমেও চলে উৎসব। সেখানে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ‘আমরা করব জয়’ গান গেয়েছেন প্রধান কোচ ফিল সিমন্স, স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদ ও ম্যানেজার নাফিস ইকবাল। পরে বিসিবিতেও কেক কেটে জয় উদযাপন করা হয়।
তবে উৎসব শেষ। এখন আবার ক্রিকেট। নাফীসের ভাষ্য অনুযায়ী, দলের ভেতরে ডারউইনের জয় নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও সেটি আত্মতুষ্টিতে পরিণত হয়নি। ‘তাদের কথা শুনে মনে হয়েছে তারা খুব বেশি আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে না। তারা পরবর্তী ম্যাচের জন্য অবশ্যই উপভোগ করেছে। কিন্তু পরবর্তী ম্যাচ নিয়ে অনেক বেশি ভাবছে। তাদের কণ্ঠে অনেক খুশি প্রকাশ পেয়েছে। তবে থাকে না যে একটা ম্যাচ জিতলাম সবকিছু শেষ হয়ে গেল-এরকম অবস্থায় নেই।’
এই মানসিকতাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অস্ট্রেলিয়াকে হারানো যতটা বড় অর্জন, তার চেয়েও কঠিন হতে পারে সেই জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের আগের চক্রের দিকে তাকালেও বোঝা যায়, ফাইনালে ওঠার জন্য শুধু কয়েকটি বড় জয় যথেষ্ট নয়। গত চক্রে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা যথাক্রমে ৬৯.৪৪ ও ৬৭.৫৪ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে ফাইনালে খেলেছিল। অর্থাৎ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত যারা ধারাবাহিক থাকতে পারে, তারাই পৌঁছায় শিরোপার মঞ্চে।
বাংলাদেশ সেই পথের শুরুটা এবার দারুণভাবেই করেছে। কিন্তু সামনে পথ অনেক লম্বা। তাই এক বছর বা দেড় বছর পরের ফাইনাল নিয়ে এখনই ভাবতে চান না নাফীস।



